সোহেল খান দূর্জয়, নেত্রকোনা ২০ এপ্রিল ২০২৬ , ৩:৫১:২২ প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে এখন সোনালি ধানের সমারোহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কৃষকের ঘরে বুঝি আনন্দের ঢেউ উঠবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—মাঠে ফসলের হাসি থাকলেও কৃষকের চোখে নীরব হতাশা।
হাওরাঞ্চলখ্যাত খালিয়াজুরী উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। দীর্ঘ পরিশ্রম আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই শেষে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠার কথা থাকলেও বাজারে দরপতনে সেই আশায় ভাটা পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় বাজারে ৪১ কেজি সমান এক মণ চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অথচ সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে প্রতি মণে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১ হাজার টাকা। ফলে প্রতি মণে কৃষকের লোকসান দাঁড়াচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
স্থানীয় কৃষক লিটন মিয়া বলেন, “সব কিছুর দাম বাড়লেও ধানের দাম বাড়ে না। অনেক কষ্ট করে ফসল তুলেছি, কিন্তু উৎপাদন খরচই উঠছে না।” রসুলপুর গ্রামের কৃষক আরজু মোল্লা জানান, ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার খরচ মেটাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। ঋণের চাপের কারণে অনেকেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন, যা প্রায় ৩৬ লাখ মণের সমান। প্রতি মণে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লোকসান হিসেবে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৫৪ থেকে ৭২ কোটি টাকার মধ্যে।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মুকুল থিগিদি জানান, এখনো সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়নি। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে, তবে সংগ্রহ শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলারদের সীমিত চাহিদা ও বাজার ঝুঁকির কারণে বেশি দামে ধান কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
খালিয়াজুরী কলেজের প্রভাষক জিয়াউল হক হিমেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংকট তুলে ধরে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারাবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম জানান, কৃষকদের দুর্ভোগ প্রশাসনের নজরে এসেছে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা নিশ্চিত করা গেলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
হাওরের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে এখন এক বৈপরীত্যের ছবি—একদিকে সোনালি ধানের ঢেউ, অন্যদিকে কৃষকের নীরব হতাশা। কৃষকের প্রশ্ন একটাই, ফসল ফলিয়েও যদি লাভ না হয়, তবে এই পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?




















