সিলেট বিভাগে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দিন দিন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকার অনুমোদিত চিকিৎসকের ৫৮ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। এই ভয়াবহ সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত মৌলভীবাজার জেলা।
চার জেলার উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট মেডিকেল অফিসারের মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ৫২৬টি। অথচ এর মধ্যে মাত্র ২২৫ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। বাকি ৩০১টি পদ শূন্য।
জেলাভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
-
সিলেট: ১৭১ পদের বিপরীতে কর্মরত ১০২ জন
-
সুনামগঞ্জ: ১৩৩ পদের বিপরীতে ৫৭ জন
-
হবিগঞ্জ: ১১৯ পদের বিপরীতে ৪৪ জন
-
মৌলভীবাজার: ১০৩ পদের বিপরীতে মাত্র ২২ জন চিকিৎসক কর্মরত
এছাড়া, উপজেলা পর্যায়ে জুনিয়র কনসালটেন্টদের ২৪১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১১০ জন কর্মরত। বাকি ১৩১টি পদ শূন্য।
চিকিৎসক সংকটের প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ওপর। সিলেট বিভাগের ৩৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৩টি ২০ শয্যার হাসপাতাল এবং ৮৫টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির কারণে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যত অচল অবস্থায়।
চিকিৎসকের বদলে কাগজে উপস্থিতি
বিশেষ করে কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে একজনও পূর্ণকালীন কর্মরত নেই। কাগজে কলমে ২ জন আবাসিক মেডিকেল অফিসার থাকলেও, বাস্তবে একজন কর্মরত সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, বেতন নিচ্ছেন কানাইঘাট হাসপাতাল থেকে। ফলে, প্রায় তিন লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক মাত্র একজন।
বিশেষজ্ঞ না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসাও সম্ভব নয়
উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ রোগীরাও জেলা সদর কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে সেসব হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে যাচ্ছে সীমাতিরিক্তভাবে।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য
ধর্মপাশা উপজেলার রোগী হারিছ মিয়া জানান, বুকের ব্যথা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক তাকে দেখে না শুনেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলেন। তিনি মনে করেন, আন্তরিক চিকিৎসা পেলে গ্রামেই সুস্থ হতে পারতেন।
স্বাস্থ্য পরিচালকের স্বীকারোক্তি ও আশ্বাস
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “চাহিদার তুলনায় চিকিৎসক কম হলেও যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন।” তিনি আরও জানান, “বিসিএস (স্বাস্থ্য) পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নতুন চিকিৎসক নিয়োগ হলে এই সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
স্বাস্থ্য খাতের এই চরম অব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসক সংকট শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে স্বাস্থ্যখাতের এ অবনতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।





























