সারাদেশ

নেত্রকোনা-৩ আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও জামায়াত ঘিরে জমে উঠেছে লড়াই

  নেত্রকোনা প্রতিনিধি ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ১১:৪৭:১৫ প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেত্রকোনা-৩ (আটপাড়া-কেন্দুয়া) আসনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বরাবরই আলোচনায় থাকে এই আসনটি। পথঘাট, হাটবাজার থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে আসনটির দায়িত্ব—এ নিয়েই কৌতূহল সাধারণ ভোটারদের।

১৯৮৪ সালে আসনটি গঠনের পর থেকে এখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও আওয়ামী লীগ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করে আসছে। বর্তমানে এ আসনে বিএনপি শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও আসন্ন নির্বাচনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ফলে এবারও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৫ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪ হাজার ৬২৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৯ জন। চার লাখের বেশি ভোটারের এই আসনে কৃষি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা পরিবর্তন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল। জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী মো. খাইরুল কবির নিয়োগী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. আবুল হোসেন তালুকদার, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী মো. শামসুদ্দোহা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. জাকির হোসেনও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।

বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি অর্ধশতাধিক মামলার ভুক্তভোগী। এর আগে ২০০৬, ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় এলাকায় তার সমর্থন উল্লেখযোগ্য বলে দলীয় সূত্র দাবি করছে।

তবে বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল। মনোনয়ন ঘোষণার আগে ধানের শীষ প্রত্যাশায় তিনি ব্যাপক গণসংযোগ চালান। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়ে বৈধতা পান তিনি। দুলাল জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও কেন্দুয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া তিনি কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, কেন্দুয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং কান্দিউড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করায় তারও একটি শক্ত ভোটব্যাংক রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে এই আসনে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিএনপির দুই প্রার্থীর কেউই সহজ পথে জয় পাবে না। এই সুযোগে জামায়াত প্রার্থী ঘুরে দাঁড়াতে পারেন বলেও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। সে ভোট যিনি নিজের পক্ষে নিতে পারবেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই বিজয়ের কাছাকাছি থাকবেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ভোটারদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট। কেউ বলছেন, নির্যাতিত নেতা হিসেবে রফিকুল ইসলাম হিলালীকে সংসদে পাঠাতে চান। আবার কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি থাকা দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলালই শেষ হাসি হাসবেন। আবার কেউ কেউ পরিবর্তনের আশায় জামায়াতকে একবার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলছেন।

এ বিষয়ে ধানের শীষের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, “আমি দীর্ঘদিন মাঠে ছিলাম এবং আছি। জনগণের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। মানুষ শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার প্রতীক ধানের শীষকে বিজয়ী করবে, ইনশাল্লাহ।”
বিদ্রোহী প্রার্থী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটিকে দলের জন্য কোনো বড় সমস্যা মনে করি না। ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।”

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল বলেন, “আমি দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি ছিলাম। মানুষের সঙ্গে আমার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে আমি বিজয়ী হব, ইনশাল্লাহ।”

জামায়াত মনোনীত প্রার্থী খাইরুল কবির নিয়োগী বলেন, “মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আমরা মাঠ পর্যায়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি। ভোট সুষ্ঠু হলে জনগণ আমাদের পক্ষে রায় দেবে, ইনশাআল্লাহ।”

সব মিলিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৩ আসনে কার হাতে যাবে বিজয়, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। আটপাড়া ও কেন্দুয়ার মানুষের প্রধান প্রত্যাশা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান। সে কারণে এই আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

আরও খবর

Sponsered content