হুমায়ুন কবির, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি ২ জুন ২০২৬ , ১১:৪৯:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হতো। স্বামীর সীমিত আয়ে চলা পরিবারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নুরেশা আক্তার। ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখে শুরু করা ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনের উদ্যোগ আজ তাকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। বর্তমানে তিনি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আয় করছেন।
উপজেলার রাতোর ইউনিয়নের আটকরা গ্রামের বাসিন্দা নুরেশা আক্তারের সাফল্যের গল্প এখন স্থানীয়ভাবে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।
মঙ্গলবার (২ জুন) সরেজমিনে গিয়ে কথা হলে তিনি জানান, অভাবের সংসারে নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই একদিন ইউটিউবে কেঁচো সার তৈরির একটি ভিডিও দেখেন। এরপর অল্প কয়েকটি কেঁচো সংগ্রহ করে বাড়ির আঙিনায় পরীক্ষামূলকভাবে জৈব সার উৎপাদন শুরু করেন।
শুরুর দিকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি, কেউ কেউ উপহাসও করেছেন। তবে তিনি থেমে না গিয়ে ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের উদ্যোগ চালিয়ে যান।
ধীরে ধীরে তার উৎপাদিত জৈব সারের চাহিদা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে স্থানীয় কৃষকদের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি উপজেলা কৃষি বিভাগের নজরেও আসে তার উদ্যোগ। কৃষি বিভাগ তাকে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, উৎপাদন ঘর, পিট নির্মাণ, ভার্মি কম্পোস্ট সেপারেটিং মেশিন এবং সিলিং মেশিন প্রদান করে সহযোগিতা করে। এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিওও বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়েছে।
নুরেশা জানান, ২০২৩ সালে তাদের উদ্যোগ নতুন গতি পায়। জৈব সারের চাহিদা বাড়তে থাকায় তার স্বামী চাকরি ছেড়ে এই উদ্যোগে যুক্ত হন। পরে তারা ‘ফসল বন্ধু জৈব সার’ নামে প্যাকেটজাত পণ্য বাজারজাত শুরু করেন।
বর্তমানে তাদের খামারে দুটি উৎপাদন শেড, ১৫টি পিট ও ৫০টি রিং রয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ১০ মেট্রিক টন ভার্মি কম্পোস্ট এবং ১০ কেজি কেঁচো উৎপাদিত হচ্ছে। এসব বিক্রি করে সব ধরনের ব্যয় বাদ দিয়ে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা লাভ করছেন তারা।
শুধু নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নই নয়, তাদের খামারে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন আরও তিনজন নারী।
নুরেশা আক্তার বলেন, “শুরুতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু হাল ছাড়িনি। এখন নিজের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও কাজের সুযোগ দিতে পারছি, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
রাণীশংকৈল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, “ভার্মি কম্পোস্ট মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। নুরেশা আক্তারের উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে নারীরাও সফল কৃষি উদ্যোক্তা হতে পারেন।”
স্থানীয়দের মতে, নুরেশার সাফল্যের গল্প শুধু একটি পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের কাহিনি নয়, এটি গ্রামীণ নারীদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।




















