সারাদেশ

ঈদের আনন্দের বাইরে সুন্দরগঞ্জ হাসপাতালের বেডে কাটছে অনেকের কোরবানির ঈদ

  **হাবিবুল্লাহ্ সরকার, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি** ২৯ মে ২০২৬ , ১২:৫৯:৫৭ প্রিন্ট সংস্করণ

 

কোরবানির ঈদ এসেছে। সারা দেশে পশু জবাইয়ের আওয়াজ, গোশতের ঘ্রাণ আর নতুন পোশাকে শিশুদের ছোটাছুটি। প্রতিটি উঠোনে উৎসবের আমেজ। কিন্তু সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিস্তব্ধ ওয়ার্ডগুলোতে সেই উৎসবের হাওয়া পৌঁছায়নি। এখানে ঈদ নেমেছে ভিন্ন রূপে—সাদা চাদর, স্যালাইনের শিশি আর চোখের নোনাজলে।

ঈদুল আজহার আগের দিন হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনের সঙ্গে। তাদের গল্প শুনতে শুনতে ভারী হয়ে আসে মন।

স্বামীর হাত ধরে হাসপাতালের করিডোরে বসে ছিলেন রাশেদা বেগম (৫৫)। চোখ দুটো লাল, বারবার আঁচল দিয়ে মুছছিলেন। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর।

তিনি বলেন, “একটা ঈদও ঠিকমতো করতে পারি না। দুঃখের কথা কাকে বলব? এখানে একা থাকি, ঠিকমতো ঘুমও হয় না। বাড়িতে থাকলে নাতি-নাতনিদের নিয়ে কত আনন্দ করতাম। ভেতরের কষ্ট কেউ জানে না, শুধু আল্লাহ জানেন।”

তার স্বামী মোজাম্মেল হোসেন (৬৫) সুন্দরগঞ্জের কান্দিরবাজার এলাকার পরিচিত মুখ। দীর্ঘদিন স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করেছেন। পাঁচ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর থেকে মস্তিষ্কজনিত জটিলতায় ভুগছেন।

দুই ছেলে ও এক মেয়ে—সবারই নিজস্ব সংসার রয়েছে। বড় ছেলে একটি এনজিওতে কর্মরত এবং ছোট ছেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

মোজাম্মেল হোসেন ম্লান হেসে বলেন, “সারা জীবনে ঈদের জামাত কখনো মিস করিনি। এবার হলো না। এটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট।”

একজন ইমামের কাছে ঈদের জামাতে অংশ নিতে না পারার বেদনা যে কত গভীর, তা হয়তো তিনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।

পাশের বেডে ছিলেন বেলকা বেপারিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মমতাজ উদ্দীন (৭০)। জীবনের সত্তরটি বছর পার করলেও এবারের ঈদ তাঁর জীবনে নিয়ে এসেছে অন্যরকম বেদনা।

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক ভাইয়ের হামলায় আহত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। কোরবানির ঈদ কাটে হাসপাতালের বেডে, ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে।

ঈদ কেমন কাটছে জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে বলেন, “হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে কি আর ঈদ হয়? এখানে যারা থাকে, তারাই বোঝে।”

সত্তর বছর বয়সে এসে ভাইয়ের হাতে আহত হওয়া এবং ঈদের দিনটি হাসপাতালের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কাটানো—এ যেন এক নির্মম বাস্তবতা।

আরেক বেডে ছিলেন গাইবান্ধার মোহনপুর ইউনিয়নের এক তরুণ। ঈদের চার দিন আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর ডান হাতে জটিল আঘাত রয়েছে।

এই ঈদে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, আড্ডা আর আনন্দের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সব পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে। এখন উৎসবের বদলে তাঁর সঙ্গী শুধু যন্ত্রণা আর হাসপাতালের চার দেয়াল।

তিনি বলেন, “জীবনে ঈদ সবার জন্য এক রকম হয় না। যারা হাসপাতালে পড়ে থাকে, অসুস্থ শরীরে দিন কাটায়, তারাই বোঝে ঈদ কতটা বেদনার, কতটা কষ্টের।”

কথা বলতে বলতে চোখের কোণে জমে ওঠা জল হাত দিয়ে মুছে নেন তিনি।

কয়েক দিনের মধ্যেই কোরবানির পশুর রক্তের গন্ধ মিলিয়ে যাবে, উৎসব শেষ হবে, মানুষ নিজ নিজ কাজে ফিরে যাবে। কিন্তু হাসপাতালের এই মানুষগুলো তখনও হয়তো পড়ে থাকবেন একই বেডে, একই অপেক্ষায়।

তাঁরাও চেয়েছিলেন একটু আনন্দ, একটু উৎসব। রাশেদা বেগম চেয়েছিলেন স্বামীকে সুস্থ দেখতে। মোজাম্মেল হোসেন চেয়েছিলেন ঈদের জামাতে অংশ নিতে। মমতাজ উদ্দীন চেয়েছিলেন পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। আর সেই তরুণ চেয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে।

কিন্তু বাস্তবতা তাদের সেই সুযোগ দেয়নি।

ওষুধের গন্ধমাখা এই ওয়ার্ডে যারা শুয়ে আছেন, তাঁরাও কারো বাবা, কারো মা, কারো সন্তান, কারো বন্ধু। উৎসবের এই দিনে তাঁদের কথাও মনে রাখা দরকার। দরকার একটু খোঁজ নেওয়া, একটু পাশে দাঁড়ানো।

কারণ ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পাশের মানুষটিও হাসতে পারে।

আরও খবর

Sponsered content