রাজনীতি

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত: বেগম খালেদা জিয়া

  ডেস্ক রিপোর্ট ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৮:১৫:২৮ প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া নিঃসন্দেহে এক অবিস্মরণীয় নাম। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—তিনি কি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ? নাকি বিশ্ব রাজনীতির বিরল উদাহরণগুলোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত?

নিতান্ত অনিচ্ছায়, দলের নেতা-কর্মীদের দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও অনুরোধের পর রাজনীতিতে আসেন তিনি। একজন গৃহবধূ থেকে মাত্র আট বছরের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী—এমন নজির বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে হাতে গোনা কয়টিই বা আছে?

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে কিছু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়াকে দেখা গেলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার কোনো সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল না। দুই সন্তান ও সংসারই ছিল তার পুরো জগৎ। রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল না বললেই চলে। অথচ সময়ের নির্মম বাস্তবতায় সেই গৃহবধূই পরিণত হন ‘আপসহীন নেত্রী’-তে।

রাজনীতিতে এসে তিনি শুধু নিজেকে বদলাননি, বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ। তার নেতৃত্বে বিএনপি ফের ক্ষমতায় আসে। বাংলাদেশে প্রথম নারী হিসেবে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও চক্রান্তের শিকার হয়ে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে কারাগারে তিনি ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নির্যাতনে তিনি শারীরিকভাবে প্রায় অচল হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জীবদ্দশায় স্বৈরশাসনের পতন ও তার পরিণতি প্রত্যক্ষ করতে পারাটাই তার জীবনের এক ঐতিহাসিক সৌভাগ্য।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসাটা ছিল অনেকটাই আকস্মিক। ঘর-সংসার আর দুই শিশু সন্তান নিয়েই তখন তার জীবন আবর্তিত। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীনও তিনি ছিলেন অন্তরালে। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তার সংশ্রব ছিল না। সেখান থেকেই রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসাটা ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা।

১৯৮১ সালের ৩১ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে শাহাদাত বরণ করলে বিএনপিতে নেমে আসে গভীর সংকট। তখনও বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। স্বামীর মৃত্যুর পরও রাজনীতিতে আসার কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না।

দলের প্রতিষ্ঠাতার আকস্মিক মৃত্যুতে বিএনপি কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মত ও আদর্শের মানুষদের নিয়ে গঠিত দলটিতে উপদলীয় কোন্দল ছিল শুরু থেকেই। জিয়ার মৃত্যুর পর সেই বিভক্তি আরও প্রকট হয়। একদিকে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের দমননীতি, অন্যদিকে দলীয় কোন্দল—সব মিলিয়ে অনেক বিশ্লেষকই তখন মনে করেছিলেন, বিএনপির অস্তিত্ব বিলীন হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।

জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বিএনপির চেয়ারম্যান হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। কিন্তু তার বার্ধক্য ও নেতৃত্বে নিষ্ক্রিয়তা দলে অসন্তোষ তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে দলের একাংশ বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন—রাজনীতিতে জড়াতে তিনি আগ্রহী নন।

তবুও দলের ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে দিনের পর দিন তাকে বোঝানোর চেষ্টা চলতে থাকে। বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব অপরিহার্য—এই ধারণা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন, নুরুল ইসলাম শিশু এবং একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন তিনি।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক যাত্রা। একই বছরের ৭ নভেম্বর শহীদ জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি প্রথমবারের মতো দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান এবং কিছুদিনের মধ্যেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে দেশজুড়ে তিনি পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। গৃহবন্দিত্ব, দমন-পীড়ন ও বিভাজনের রাজনীতির মধ্যেও তার দৃঢ় অবস্থান বিএনপিকে টিকিয়ে রাখে। এই আপসহীনতাই তাকে এনে দেয় জাতীয় নেতৃত্বের উচ্চতম আসনে।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। রাজনীতিতে প্রবেশের মাত্র আট বছরের মাথায় রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো—এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও এক বিরল দৃষ্টান্ত।

আরও খবর

Sponsered content