আন্তর্জাতিক

নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি, নিন্দা জানাল তেহরান

  প্রতিনিধি ২৩ আগস্ট ২০২৬ , ১১:৪৬:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানের ওপর ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের দাবি, নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি করবে এবং চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বিমান হামলা শুরুর পর প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত এখন সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলার পর্যায়ে নেই। তবে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরুরও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, বিশেষ অনুমতি ছাড়া তেলবাহী ট্যাংকার এই জলপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। ফলে শত শত জাহাজে থাকা হাজার হাজার নাবিক হরমুজে আটকা পড়েছেন।

জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর কোনোটিই বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী ছিল না।

তবে ইরান বাগদাদের বারবার অনুরোধের পর কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের ইরাক সফরের সময় বাগদাদের অন্যতম প্রধান অনুরোধ ছিল এই অনুমতি।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক সহায়তায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পথে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হতো, যা বিশ্বের মোট দৈনিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

এদিকে নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা জাতিসংঘের প্রতিটি স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ‘সীমান্তের বাইরে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এ ধরনের সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগামী সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে। এর আগে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীনের প্রতি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। তবে বেইজিং সংঘাতের সমাধানে কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে আসছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতাকারী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, যেসব দেশ ওয়াশিংটনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দেবে, তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, ‘সব প্রতিবেশী দেশকে আমরা বলছি, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দেবেন না। অন্যথায় আমরা তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করব।’

অন্যদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদোল্লাহি একটি ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনে তিনি দাবি করেন, কারখানাটি আগের তুলনায় আরও উন্নত সক্ষমতা, গুণগত মান ও পরিমাণে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফও জানিয়েছেন, নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তেহরান ‘অসংখ্য বার্তা’ পেয়েছে। তবে তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। কালিবাফ অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তার মতে, একটি স্বাধীন ও আঞ্চলিকভাবে পরিচালিত নিরাপত্তা কাঠামোই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।

এদিকে যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের উৎখাতের মতো যে লক্ষ্যগুলোর কথা বলেছিলেন, সেগুলোর অগ্রগতি এখনো স্পষ্ট নয়। ২০২৫ সাল থেকে জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকেরা ইরানে প্রবেশ করতে না পারায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থাও অনিশ্চিত।

ছয় মাসের সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ইরানের নাগরিক। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানে ১৬৮ জন স্কুলশিশু নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৭৫০ জনের বেশি সামরিক সদস্য আহত এবং ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

তবে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন। শুক্রবার ইরানি সংবাদ সংস্থা ইসনা তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, শক্তিশালী অবস্থানে থাকা এবং নিজেদের মর্যাদা বজায় রেখেই যুদ্ধ শেষ করা ইরানের জন্য ভালো হবে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ থাকা, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং ইরানের পাল্টা সামরিক ও অর্থনৈতিক হুঁশিয়ারির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।

আরও খবর

Sponsered content