এটিএম রাকিবুল বাসার সম্পাদক, দৈনিক মতপ্রকাশ ১ এপ্রিল ২০২৬ , ৭:১৮:৫৮ প্রিন্ট সংস্করণ
জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রশ্ন আজ আর কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তেল-গ্যাসনির্ভর বাস্তবতায় জ্বালানির অপচয় মানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং উন্নয়নের গতি থেমে যাওয়া। তাই সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সাশ্রয় কীভাবে অর্জিত হবে? এমনভাবে কি, যাতে জাতির ভবিষ্যৎই ঝুঁকির মুখে পড়ে?
সম্প্রতি জ্বালানি সংকট মোকাবিলার নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে অনলাইন নির্ভরতায় ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। এটি কেবল একটি নীতিগত ভুলই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর একটি সিদ্ধান্ত। কারণ শিক্ষা কোনো সাময়িক কার্যক্রম নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া – যার ওপর নির্ভর করে একটি প্রজন্মের মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশ।
করোনাকালে আমরা বাধ্য হয়ে অনলাইন শিক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেটি ছিল জরুরি পরিস্থিতির বিকল্প ব্যবস্থা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে এর সীমাবদ্ধতা। দেশের বড় একটি অংশ তখন নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, উপযুক্ত ডিভাইস কিংবা সহায়ক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত ছিল। অনেক শিক্ষার্থী পাঠচ্যুত হয়েছে, অনেকে পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়েছে। যেখানে শহরের কিছু শিক্ষার্থী কোনোভাবে সংযুক্ত থাকতে পেরেছে, সেখানে গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছে অনেক দূর।
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য আদান-প্রদান নয়। এটি একটি মানবিক ও আন্তঃক্রিয়াশীল প্রক্রিয়া। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি যোগাযোগ, সহপাঠীদের সঙ্গে মতবিনিময়, তাৎক্ষণিক প্রশ্নোত্তর—এসবই শেখার প্রাণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এই অভিজ্ঞতাকে পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। সেখানে শিক্ষকের পক্ষে শিক্ষার্থীর মনোযোগ, দুর্বলতা কিংবা মানসিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়নও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদান কেন্দ্র নয়; এটি সামাজিকীকরণ, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্র। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।
এমন বাস্তবতায় জ্বালানি সাশ্রয়ের নামে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে সহজ টার্গেট বানানো অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। সাশ্রয়ের জন্য আরও বহু কার্যকর ক্ষেত্র রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, সরকারি-বেসরকারি অফিসে শক্তি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, শিল্পখাতে দক্ষ প্রযুক্তি প্রয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি। এসব জায়গায় বাস্তব উদ্যোগ নিলে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব, অথচ শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
একটি জাতির জন্য জ্বালানি যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য তার শিক্ষিত নাগরিক। জ্বালানি সংকট সময়ের সঙ্গে কাটিয়ে ওঠা যায়; কিন্তু শিক্ষা ব্যাহত হলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করা কঠিন। একটি প্রজন্ম পিছিয়ে পড়লে তার দায় বহন করতে হয় পুরো জাতিকেই।
তাই নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান রইলো আপনারা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করুন, কিন্তু তা যেন ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে না ঠেলে দেয় । শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা সহজ সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। সংকটের মধ্যেও শ্রেণিকক্ষ খোলা রাখা, পাঠদান চালু রাখাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার জ্বালানিতে নয়—তার শিক্ষিত, সচেতন ও সক্ষম নাগরিকের মধ্যে।




















