মোক্তার হোসেন, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি ৩ জুন ২০২৬ , ১০:৩৬:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলীয় জনপদে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি এখন বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং লবণাক্ততার কারণে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ নলকূপে পানি উঠছে না। অন্যদিকে চারপাশের পুকুর ও জলাশয়ের পানি লবণাক্ত হওয়ায় তা পান উপযোগী নয়। ফলে কোথাও সুন্দরবনের ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে ট্রলারে করে পানি কিনে আনা হচ্ছে, আবার কোথাও বাধ্য হয়ে মানুষ অনিরাপদ পুকুরের পানি ব্যবহার করছেন।
বাগালী ইউনিয়নের বাসিন্দা দীপা রানি জানান, খাবার পানি সংগ্রহের জন্য তাকে বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। খরার সময় কয়েক দিনের পানি একসঙ্গে কলস ও ড্রামে করে সংগ্রহ করে রাখতে হয়।
তিনি বলেন, “দুই-তিনটি পরিবার মিলে একটি পানির ট্যাংকি পেয়েছি, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। পানি নিয়ে আমাদের কষ্টের শেষ নেই।”
কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. লুৎফর রহমান সরদার বলেন, “আমাদের ইউনিয়নে প্রায় ৬২ হাজার মানুষ বাস করেন। বর্তমানে অনেকেই সুন্দরবনের একটি ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে ট্রলারে করে পানি কিনে আনছেন। সরকারি ট্যাংকি বিতরণ হলেও তা এখনো সবার কাছে পৌঁছায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আগে পুকুরের পানি ব্যবহার করে মানুষ অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু পুকুরগুলো হারিয়ে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। সরকারি উদ্যোগে পুকুর খনন ও দখল হওয়া পুকুর উদ্ধার জরুরি।”
আমাদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, তার ইউনিয়নের ২৭টি গ্রামে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। সরকারি ট্যাংকি বিতরণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় অধিকাংশ পরিবারকে পানির কষ্টে ভুগতে হচ্ছে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কয়রার সাতটি ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য এ পর্যন্ত ৪ হাজার ২৪০টি প্লাস্টিকের ট্যাংক বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও ৮ হাজার ২৯২টি ট্যাংক বরাদ্দের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাগালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সামাদ গাজী বলেন, “পর্যাপ্ত সুপেয় পানির উৎস না থাকায় অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে পুকুরের পানি পান করছেন। যদিও পুকুরের পানি কিছু সময় রেখে পরিশোধিত করে ব্যবহার করা হয়, তবুও এটি স্থায়ী সমাধান নয়।”
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী বলেন, “ব্যক্তিগত পুকুরগুলো ছোট হওয়ায় সেখান থেকে সবসময় পানি পাওয়া যায় না। ফলে মানুষকে সরকারি পুকুরের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিছু এনজিও পানি শোধন কার্যক্রম চালালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।”
উত্তর বেদকাশী ও মহারাজপুর ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপদ পানির সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে পানির ট্যাংকি বিতরণসহ চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওও কাজ করছে।”
স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী উদ্যোগের পাশাপাশি পুকুর খনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। তা না হলে ভবিষ্যতে উপকূলীয় এ অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।




















