ধর্ম

কুরআনের আলোকে প্যারেন্টিং: দয়া, দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

  এটিএম রাকিবুল বাসার ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:৫৮:২০ প্রিন্ট সংস্করণ

“রব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা” এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ দোয়াটি আল্লাহ তাআলা আমাদের শিখিয়েছেন সূরা আল-ইসরা-এর ২৪ নম্বর আয়াতে। এই আয়াতের মাধ্যমে কেবল বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বই নয়, বরং বাবা-মায়ের প্যারেন্টিং দর্শনের একটি মৌলিক ভিত্তিও স্থাপন করা হয়েছে-তা হলো দয়া, মমতা ও মানবিক লালন-পালন।

প্যারেন্টিং: একটি আমানত ও ইবাদত

ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান কেবল একটি পারিবারিক দায়িত্ব নয়; বরং একটি আমানত। বাবা-মা হলেন সেই আমানতের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয় ও প্রথম আদর্শ। শিশু তার চারপাশের পৃথিবীকে যেমন দেখে, যেভাবে অনুভব করে—তার ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবার থেকেই।
যে বাবা-মা সন্তানের শৈশবে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও নিরাপত্তা দেন, সন্তান বড় হয়ে ঠিক সেই গুণগুলোই সমাজে প্রতিফলিত করে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা সন্তানকে শেখান—তোমরা তোমাদের পিতা-মাতার জন্য দোয়া করো, কারণ তারা তোমাদের শৈশবে নিঃস্বার্থভাবে লালন-পালন করেছে।

গালিগালাজ ও মারধর: ভুল প্যারেন্টিংয়ের একটি নির্মম রূপ

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো , আমাদের সমাজে এখনো অনেক বাবা-মা মনে করেন, গালিগালাজ ও শারীরিক শাস্তিই শাসনের একমাত্র উপায়। শিশুকে কথা না শুনলে মারধর করা, অপমানজনক ভাষায় কথা বলা, অন্যদের সামনে হেয় করা—এসবকে অনেক সময় “শিক্ষা দেওয়া” বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু বাস্তবে এগুলো শিশুর চরিত্র গঠনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

  • শিশু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে ।
  • আত্মবিশ্বাস হারায় ।
  • ভয়, রাগ ও হিংস্রতা তার ভেতরে জমা হতে থাকে ।
  • সে শেখে—সমস্যার সমাধান জোর ও অপমান দিয়ে করতে হয় । 
  • এই ধরনের প্যারেন্টিং শিশুর হৃদয়ে ভালোবাসার পরিবর্তে ভয় ও ক্ষোভ তৈরি করে।

 

শৈশবের আঘাত ও ভবিষ্যতের প্রতিফলন

শৈশবে পাওয়া মানসিক আঘাত কখনো হারিয়ে যায় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। যে শিশু বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভালোবাসা ও সম্মান পায়নি, সে বড় হয়ে প্রায়ই—

  • বাবা-মা থেকে দূরে সরে যায় । 
  • তাদের প্রতি দায়িত্ববোধ কম অনুভব করে । 
  • কখনো কখনো অবহেলা বা কঠোর আচরণ প্রদর্শন করে । 

এখানেই সূরা আল-ইসরা-এর এই দোয়ার গভীর তাৎপর্য ফুটে ওঠে। আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—তোমরা যখন বড় হবে, তখন যেন তোমাদের বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করতে পারো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি শৈশবটাই হয় নির্যাতনের, তাহলে সেই দোয়া কি হৃদয় থেকে বের হবে?

সঠিক প্যারেন্টিং: দয়া ও সংলাপের চর্চা

সঠিক প্যারেন্টিং মানে সন্তানকে নিখুঁত বানানো নয়; বরং তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
এর মূল উপাদানগুলো হলো—

  • ভালোবাসা ও নিরাপত্তা দেওয়া ।
  • ভুল করলে ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো ।  
  • শাস্তির বদলে সংলাপ ও দিকনির্দেশনা । 
  • সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া । 

 

নবী করিম (সা.) কখনো শিশুদের ওপর কঠোরতা করেননি; বরং স্নেহ ও সহানুভূতির মাধ্যমে তাদের হৃদয় জয় করেছেন। এটিই ইসলামী প্যারেন্টিংয়ের প্রকৃত আদর্শ।

“রব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা”-এই দোয়া কেবল সন্তানের মুখে উচ্চারিত হওয়ার জন্য নয়; এটি বাবা-মায়ের জন্যও একটি আত্মসমালোচনার আয়না। আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের এমনভাবে লালন-পালন করছি, যাতে তারা বড় হয়ে অন্তর থেকে আমাদের জন্য এই দোয়া করতে পারে?
শিশুকে গালিগালাজ ও মারধর করে নয় -ভালোবাসা, দয়া ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে গড়ে তুললেই একটি সুন্দর পরিবার, সুস্থ সমাজ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।

 

লিখেছেন: এটিএম রাকিবুল বাসার  ।। সাংবাদিক ।। সম্পাদক ।। গবেষক 

আরও খবর

Sponsered content