প্রতিনিধি ১৮ মে ২০২৬ , ১১:২৬:০৪ প্রিন্ট সংস্করণ
পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি মাস। বিশেষ করে এই মাসের প্রথম ১০ দিনকে ইসলামে বছরের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হজ, কোরবানি, রোজা, জিকির ও তওবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দিনগুলো। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এই দশ রাতের শপথ করে এর মর্যাদা ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘শপথ প্রত্যুষের এবং দশ রাতের।’ (সুরা ফাজর: ১-২)। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এখানে ‘দশ রাত’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকেই বোঝানো হয়েছে। এ সময় আল্লাহর স্মরণ, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে বান্দা তার নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ পায়।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হজ সম্পাদন সুবিদিত মাসসমূহে (শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ)। অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে (ইহরামের নিয়ত করে), তার জন্য স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়। তোমরা উত্তম কাজ যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা পাথেয়র ব্যবস্থা করো; নিশ্চয়ই তাকওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে জ্ঞানী ব্যক্তিগণ, তোমরা আমাকে ভয় করো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৯৭)
হাদিসে এ মাসের প্রথম ১০ দিনকে শ্রেষ্ঠতম দিন বলা হয়েছে। যেমন হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘এমন কোনো দিন নেই যার আমল জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হবে।’ প্রশ্ন করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসূল সা.! আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা থেকেও কি অধিক প্রিয়?’রাসূল সা. বললেন, ‘হ্যাঁ, যুদ্ধ করা থেকেও অধিক প্রিয়। তবে যদি এমন হয় যে ব্যক্তি তার জানমাল নিয়ে আল্লাহর পথে বের হলো এবং এর কোনো কিছুই ফেরত নিয়ে এলো না।’ (বুখারি ও তিরমিজি)
হাদিসের আলোকে এ দিনগুলোতে আমাদের করণীয় আমলসমূহ সম্পর্কে চলুন সংক্ষেপে জেনে নিই-
বেশি বেশি নেক আমল করার তাগিদ
ইসলামে জিলহজের প্রথম দশকে নফল ইবাদতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দান-সদকার মতো আমলগুলো এ সময় আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয় বলে বিবেচিত। হাদিসে এসেছে, এই দিনগুলোর আমল অন্য যেকোনো দিনের আমলের চেয়ে উত্তম।
তওবা ও ইস্তিগফারের উত্তম সময়
ইসলামি শিক্ষায় বলা হয়েছে, এই সময় আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। অতীতের ভুল ও গুনাহ থেকে ফিরে এসে নতুনভাবে জীবন গড়ার জন্য তওবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের বেশি বেশি ক্ষমা চাইতে উৎসাহিত করেছেন।
জিকিরে মশগুল থাকার নির্দেশনা
উলামায়ে কেরামের মতে, জিলহজের প্রথম ১০ দিনে বেশি বেশি তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ পাঠ করা সুন্নত। বিশেষ করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পাঠের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নখ ও চুল না কাটার আমল
যারা পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানি করার ইচ্ছা রাখেন, তাদের জন্য জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নখ, চুল ও শরীরের পশম না কাটাকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে। হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়।
রোজার বিশেষ ফজিলত
সম্ভব হলে জিলহজের প্রথম তারিখ থেকে নয় তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা। বা এরমধ্যে যে কয়দিন সম্ভব হয়— রোজা রাখা। তবে নয় তারিখ অর্থাৎ, ঈদের আগের দিন অবশ্যই রোজা রাখার চেষ্টা করা। কেননা এই এক দিনের রোজার ফলে এক বছর আগের ও এক বছর পরের মোট দুই বছরের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।
আল্লাহর নবী সা. বলেন, ‘আমি আশা করি, আরাফার দিন অর্থাৎ জিলহজের নয় তারিখের রোজার ফলে আল্লাহ তাআলা এক বছর আগের ও এক বছর পরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।’(মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
জিলহজের প্রথম নয় দিন- রোজা রাখার বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো সনদের বিচারে দুর্বল হলেও মুহাদ্দিসগণ এ গুলোকে সমষ্টিগতভাবে আমলযোগ্য বলেছেন। (লাতায়িফুল মাআরিফ; ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি, পৃষ্ঠা : ৩৫২-৩৫৩ )
সামর্থ্যবানদের জন্য হজ
জিলহজ মাসেই মুসলমানরা হজ পালন করেন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম এই ইবাদত সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য জীবনে একবার ফরজ। হজ মানুষকে আত্মশুদ্ধি ও পাপমুক্ত জীবনের শিক্ষা দেয়।
তাকবিরে তাশরিক পাঠ
৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করার বিধান রয়েছে। পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিম্নস্বরে এটি পাঠ করবেন।
গুনাহ থেকে দূরে থাকার গুরুত্ব
ইসলামে বলা হয়েছে, পবিত্র এই দিনগুলোতে যেমন নেক আমলের সওয়াব বৃদ্ধি পায়, তেমনি গুনাহ থেকেও সতর্ক থাকতে হয়। আল্লাহ তাআলা প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের পাপ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
আরাফার দিনের রোজা
জিলহজের প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ৯ জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিনটি বিশেষভাবে ফজিলতপূর্ণ। এ দিনে দোয়া-দরুদ ও ইবাদতে মশগুল থাকা উচিত। বিশেষ করে এ দিন রোজা রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে তিনি এর মাধ্যমে বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
কোরবানির গুরুত্ব
জিলহজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করার বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি ত্যাগের শিক্ষা লাভ করা যায়।
বেশি বেশি দোয়া করার আহ্বান
দোয়া ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিশেষ করে রোজাদার ব্যক্তির ইফতারের আগের সময়কে দোয়া কবুলের অন্যতম উত্তম মুহূর্ত বলা হয়েছে। তাই জিলহজের এই বরকতময় দিনগুলোতে বেশি বেশি মোনাজাত করা উচিত।
আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করা
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্রদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়। হাদিসে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, জিলহজের প্রথম ১০ দিন একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের বিশেষ সুযোগ। তাই এই সময়টিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।














