বিশেষ প্রতিবেদন

কড়াইল বস্তিতে মাদক-জুয়ার ভয়াবহ বিস্তার, মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে

  বিশেষ প্রতিনিধি ৩১ আগস্ট ২০২৬ , ৭:০৮:৪৮ প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে মাদক ও জুয়ার বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অভিযানে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে কবুতর ব্যবসার আড়ালে পরিচালিত একটি মাদকের আস্তানা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় সেখান থেকে ৬১০ গ্রাম হেরোইন, ২৫৩ পিস ইয়াবা, বিদেশি মদ, গাঁজা এবং নগদ ৪৩ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এত বিপুল পরিমাণ মাদক ও অর্থ উদ্ধারের পরও ওই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি মমিন ওরফে ‘কবুতর মমিন’ ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় সচেতন মহলের প্রশ্ন, একটি ঘর থেকেই বিপুল পরিমাণ মাদক ও নগদ টাকা উদ্ধার হলে পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে থাকা মাদকের আখড়াগুলোর চিত্র কতটা ভয়াবহ?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কড়াইল বস্তির বিভিন্ন অলিগলিতে প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বিক্রি ও অনলাইন জুয়ার বেটিং। স্থানীয় বিভিন্ন চায়ের দোকানে স্মার্টফোনের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে তরুণ ও যুবসমাজের একটি অংশ জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবারিদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য ও তথাকথিত ‘সোর্সের’ যোগসাজশ রয়েছে। অভিযানের আগেই সোর্সদের মাধ্যমে খবর পেয়ে মূল হোতারা আত্মগোপন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি স্থানীয় কিছু সোর্স সরাসরি মাদক কারবারে জড়িত বলেও দাবি করেন তারা। আধিপত্য বিস্তার বা দেনা-পাওনার বিরোধে প্রতিদ্বন্দ্বী কারবারিদের ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন চায়ের দোকানে অনলাইন জুয়ার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে এবং মাদক কারবারিদের কাছ থেকে একটি অসাধু চক্র নিয়মিত মাসোহারা আদায় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিছু প্রভাবশালী চক্র এসব অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কড়াইল বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, “মাদক বেচাকেনা এখন একদম প্রকাশ্যে হয়। মাঝে মাঝে অভিযান হয়, কিন্তু বড় মাথারা আগেই খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। দুই-এক দিন পর আবার সব আগের মতোই চলে। পুলিশ আর সোর্সদের মাসোহারা দিয়েই এরা ব্যবসা চালাচ্ছে।”

কড়াইলে মাদক ও জুয়ার বিস্তার এবং অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁসের অভিযোগ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান বলেন, “কড়াইল বস্তিতে মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। সম্প্রতি আমরা একটি বড় আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও মাদক উদ্ধার করেছি। পলাতক গডফাদার ‘কবুতর মমিন’সহ মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে আমাদের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভেতরের কোনো সোর্স বা কারও তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মাসোহারা গ্রহণ ও পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বনানী থানা পুলিশ মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোনো পুলিশ সদস্য বা অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসোহারা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কড়াইল বস্তিকে মাদকমুক্ত করতে আমরা অচিরেই বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করব।”

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ এ বস্তিকে মাদক ও জুয়ামুক্ত করতে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। অভিযানের পাশাপাশি সোর্স ব্যবস্থা সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের অসাধু চক্র চিহ্নিত করা এবং মাদক কারবারের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

আরও খবর

Sponsered content