ধর্ম

খাদ্যগ্রহণে ইসলামের পাঁচ নীতি

  প্রতিনিধি ১৫ আগস্ট ২০২৬ , ২:৪৬:২৬ প্রিন্ট সংস্করণ

একজন মুমিনের জীবন শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় কাজ হলো খাবার গ্রহণ। একজন মুমিন খাবার খান শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার উদ্দেশ্যে, যাতে তিনি আল্লাহর ইবাদত, মানুষের অধিকার এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন। তাই খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রেও ইসলামের রয়েছে সুন্দর কিছু নির্দেশনা। মুমিনের খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত তা পাঁচটি মূলনীতির মাধ্যমে তুলে ধরা যায়।

১. খাবার হতে হবে হালাল ও পবিত্র

মুমিনের প্রথম দায়িত্ব হলো খাবার হালাল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। শুধু হালাল হলেই যথেষ্ট নয়; খাবারটি পবিত্র, স্বাস্থ্যসম্মত ও ভালো মানের হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী পরিভাষায় এমন খাবারকে ‘তাইয়িব’ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকর্ম করো।’ – সুরা মুমিনুন, ৫১

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র, তা থেকে আহার করো।’- সুরা বাকারা, ১৬৮

অতএব, একজন মুমিন খাবার বাছাইয়ের সময় তার উৎস, উপাদান ও পবিত্রতার বিষয়টি গুরুত্ব দেবেন।

২. শরীরের জন্য উপকারী খাবার বেছে নেওয়া

ইসলাম মানুষের সুস্থতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাই এমন খাবার থেকে বিরত থাকা উচিত, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। সুস্থ শরীর একজন মুমিনকে ইবাদত ও দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনে সক্ষম করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে গনিমত মনে করো।’ – মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৯১৬

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের শরীরের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন করেছেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘তোমার চোখেরও তোমার ওপর হক আছে এবং তোমার শরীরেরও তোমার ওপর হক আছে।’- সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮২

তাই খাবারের ক্ষেত্রে স্বাদকে একমাত্র বিবেচনা না করে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

৩. খাবারে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা

ইসলাম কোনো কিছুতেই সীমালঙ্ঘনকে উৎসাহিত করে না। খাবারের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত খাওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অযথা কৃপণতাও কাম্য নয়। একজন মুমিন প্রয়োজন অনুযায়ী খাবেন এবং অপচয় থেকে দূরে থাকবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’-সুরা আরাফ, ৩১

খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে ভোগবাদী করে তুলতে পারে। তাই খাবার উপভোগ করা যাবে, কিন্তু তা যেন অপচয় বা অতিভোজনের পর্যায়ে না পৌঁছে।

৪. বিলাসিতা নয়, সহজ-সাধারণ খাবারে সন্তুষ্ট থাকা

ইসলাম খাবার নিয়ে অহেতুক বিলাসিতা ও প্রদর্শনকে উৎসাহিত করে না। সহজলভ্য ও সাধারণ খাবারেও সন্তুষ্ট থাকা একজন মুমিনের সুন্দর গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। পরিবারের কাছে তরকারি চাইলে যখন তাকে জানানো হলো যে ঘরে শুধু সিরকা আছে, তখন তিনি সেটিই আনতে বললেন এবং তা খেতে শুরু করলেন। এরপর তিনি সিরকার প্রশংসা করেন। – সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৫১

এ থেকে বোঝা যায়, খাবারের বৈচিত্র্য বা দাম নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৫. পেট ভরে নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী খাওয়া

মুমিনের খাদ্যাভ্যাসে তৃপ্তি থাকবে, কিন্তু অতিভোজন থাকবে না। সামনে প্রচুর খাবার থাকলেই সবটুকু খেয়ে ফেলার চেষ্টা করা ইসলামের আদর্শ নয়। আবার কম খাবার থাকলেও হতাশ না হয়ে অল্পতে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট এবং তিনজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট।’ -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৯২

এই শিক্ষা আমাদের শুধু কম খেতে নয়, বরং ভাগ করে খেতে এবং অন্যের প্রয়োজনের কথাও ভাবতে শেখায়।

খাবার আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও একজন মুমিনের কাছে এটি কেবল ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়। কী খাব, কতটুকু খাব এবং কীভাবে খাব এসবের মধ্যেও ইসলামের সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের শিক্ষা রয়েছে। হালাল খাবার, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত ভোজন, সাধারণ খাবারে সন্তুষ্টি এবং অল্পে তুষ্ট থাকা এই পাঁচটি নীতি একজন মুমিনের জীবনকে আরও সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের হালাল ও পবিত্র রিজিক দান করুন, খাবারের নিয়ামতের কদর করার তাওফিক দিন এবং অপচয় ও অতিভোজন থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

আরও খবর

Sponsered content