সারাদেশ

ভোট এলেই প্রতিশ্রুতি, ভোট গেলেই উপেক্ষা: সেতুর দাবিতে গাইবান্ধার দশ গ্রাম

  লালচাঁন বিশ্বাস সুমন ।। গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি ২০ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:৫৩:৫১ প্রিন্ট সংস্করণ

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালীতে আলাই নদীর উপর কাঠ ও বাঁশ দ্বারা নির্মিত সাঁকোতে ঝুকি নিয়ে চলছে হাজার হাজার মানুষ।

ভোট এলেই কদর বাড়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের রামনাথের ভিটা এলাকার দশ গ্রামের মানুষের। আর ভোট শেষ হলেই জনপ্রতিনিধিদের কাছে আর পাত্তা পাওয়া যায় না—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

বছরের পর বছর জনপ্রতিনিধিদের মুখে একই প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে গ্রামগুলোর ভোটাররা এখন চরমভাবে বিরক্ত। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, “আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না। ভোট দেব তাকেই, যিনি লিখিতভাবে অঙ্গীকার করবেন সাঁকোর জায়গায় স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে দেবেন।”

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের আলাই নদীতে একটি সেতু না থাকায় দশ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। নদী পার হতে হয় নড়বড়ে কাঠ ও বাঁশের সাঁকো দিয়ে। অসুস্থ রোগীকে কাঁধে করে পার করতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এই সাঁকোর কারণে নারী শিক্ষার্থীসহ অন্তত সাড়ে তিনশ দরিদ্র শিশু-কিশোর নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। বর্ষা মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় অনেকেই।

আলাই নদীবেষ্টিত এই এলাকায় রয়েছে জামাইপাড়া, মফুরজান, গোয়ালবাড়ি, রামনাথের ভিটা, পোড়াগ্রাম, সর্দারপাড়া সহ অন্তত দশটি গ্রাম। এসব গ্রামের বাসিন্দাদের নদী পার হওয়ার একমাত্র ভরসা রামনাথের ভিটা স্টেশন বাদিয়াখালী এলাকার পাকা সড়কের সঙ্গে সংযোগকারী একটি সাঁকো। এখানকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালান, কেউ পোশাক কারখানায় কাজ করেন। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় নদীবেষ্টিত এসব গ্রামেই তাদের বসবাস। অথচ তারা পাচ্ছেন না উল্লেখযোগ্য কোনো নাগরিক সুবিধা।

কিছু পরিবারের সামান্য জমিজমা থাকলেও উৎপাদিত ফসল বিক্রির মতো কাছাকাছি কোনো হাটবাজার নেই। এলাকায় তরিতরকারি ও সবজির আবাদ ভালো হলেও যানবাহন চলাচলের সুযোগ না থাকায় নড়বড়ে সাঁকো পার হয়ে পায়ে হেঁটে কিংবা কাঁধে করে সবজি বহন করতে হয়।

স্টেশন বাদিয়াখালীর বাসিন্দা ও মানবাধিকারকর্মী কাজী আব্দুল খালেক বলেন, “এসব গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই কাঠ ও বাঁশের তৈরি সাঁকো। দশ গ্রামের মানুষ নিজেরাই চাঁদা তুলে প্রতি বছর সাঁকো তৈরি করেন। ভেঙে গেলে আবার চাঁদা তুলে মেরামত করেন। নিজেদের টাকায় বাঁশ ও কাঠ কিনে সাঁকো বানানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।”

তিনি আরও বলেন, “হাজার হাজার মানুষের দাবি থাকা সত্ত্বেও এখানে দীর্ঘদিনেও একটি সেতু নির্মাণ হয়নি। ভোট এলেই প্রার্থীরা এসে বলেন—ভোট দিলে সেতু করে দেব। সেই প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে মানুষ এখন ক্লান্ত।”

তিনি জানান, এসব গ্রামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা হাটবাজার নেই। তেল-লবণ কিনতে হলেও যেতে হয় স্টেশন বাদিয়াখালী হাটে। মাথাব্যথা বা জরুরি ওষুধ কিনতেও সাঁকো পার হতে হয়। অন্তত সাড়ে তিনশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার হয়ে এপারের সরকারি স্কুলগুলোতে যায়।

এলাকাবাসীর দাবি, আলাই নদীতে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে গ্রামগুলোর মানুষের জীবনধারায় বড় পরিবর্তন আসবে। শত শত শিশু নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারবে। কৃষিপণ্য ও গরুর দুধ হাটবাজারে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি সহজ হবে। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এসব গ্রামে রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকৌশলী বাবলু মিয়া বলেন, “সেতু নির্মাণের বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা পরিষদের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। চেয়ারম্যানের সুপারিশে সেখানে বাঁশ ও কাঠের সাঁকো নির্মাণের বরাদ্দ এসেছে। তবে স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্প তৈরি করা হলেও এখনও প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া যায়নি।”

আরও খবর

Sponsered content