প্রতিনিধি ২৮ জুলাই ২০২৫ , ২:৫৭:১৮ প্রিন্ট সংস্করণ
নওগাঁ প্রতিনিধি:
নওগাঁর মান্দা উপজেলায় সৎমায়ের নির্যাতন ও পারিবারিক অমানবিকতার শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে আফরিন আক্তার রিভা (১৫) নামে এক স্কুলছাত্রী। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে স্কুলছাত্রীর বাবা ও সৎমায়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন রিভার biological মা রুমালি আক্তার।
শনিবার রাতে মান্দা থানায় রিভার মা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলে, মামলায় আসামি করা হয় পত্নীতলার কাঁটাখালি গ্রামের আকবর হোসেন (৪২) এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী রোজিনা আক্তারকে (৩৫)।
রিভা মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর বাজারে একটি ভাড়া বাসায় থেকে স্থানীয় থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল। বাবা আকবর হোসেন সম্প্রতি রোজিনা আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ে করে রুমালি আক্তার ও তাদের সন্তানদের সঙ্গেই ওই ভাড়া বাসায় এনে তুললে শুরু হয় পারিবারিক কলহ।
দুই সপ্তাহ আগে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী বাসায় আসার পর থেকেই রিভা ও তার ভাই রিয়াদের ওপর শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। গত শুক্রবার (২৫ জুলাই) সৎমায়ের হাতে মারধরের পর, পরদিন শনিবার শয়নকক্ষে দরজা বন্ধ করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে রিভা।
রিভার মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া একটি চিরকুটে হৃদয়বিদারক ভাষায় নিজের কষ্ট, ক্ষোভ এবং বাবার প্রতি অভিমানের কথা তুলে ধরেছে সে। চিঠিতে লেখা ছিল:
“আপনি আমার জীবনটা তছনছ করে দিলেন… আপনি আমার কাছ থেকে আমার মাকে কেড়ে নিলেন… আমি চলে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।… আপনার যেনো আমার কবরে মাটি দেওয়ার অধিকার না থাকে…”
চিঠিতে রিভা উল্লেখ করে, বাবা তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, ভালোবাসা ছিন্ন করে সৎমায়ের প্রেমে অন্ধ হয়ে উঠেছেন। এমনকি রিভার বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিয়ে বাবার সন্দেহ এবং তীব্র অবজ্ঞাও তাকে মানসিকভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
রিভার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্থানীয়রা ঘটনাটিকে নির্মম পারিবারিক অবহেলা ও শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর রহমান জানান, “স্কুলছাত্রী রিভার মৃত্যুর ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেছেন। তদন্ত চলছে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, রিভার মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পত্নীতলার কাঁটাখালি গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
রিভার বিদায় চিঠিটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। শিশু-কিশোরদের প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের দাবি উঠেছে সর্বত্র।
স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অনেকেই রিভার মৃত্যুকে ‘নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তির শেষ চিৎকার’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
সংবাদদাতার মন্তব্য:
রিভার আত্মহত্যা একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির বাইরে, সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা পারিবারিক সহিংসতা, অবজ্ঞা ও ভালোবাসাহীনতার করুণ চিত্র। একটি কিশোরী কতটা নিঃসঙ্গ, অবহেলিত ও মানসিক যন্ত্রণায় ছিল তা তার বিদায়বার্তায় স্পষ্ট।
এই মৃত্যুর দায় শুধু পরিবার নয়, সমাজকেও নিতে হবে। এই ঘটনা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং শিশু অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য এটি একটি জোরালো সামাজিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াক।
আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। কারও জীবনে যদি এমন মানসিক চাপ দেখা দেয়, তবে দয়া করে নিকটজনের সঙ্গে কথা বলুন, সহায়তা নিন। সবার জীবনের মূল্য আছে।





















