উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ৭ জানুয়ারি ২০২৬ , ৫:৫৬:২৩ প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে সরকারি মূল্যে চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা খাদ্য বিভাগ, কয়েকজন চাতাল ও রাইস মিল মালিক এবং একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মিল সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আমন মৌসুমে উলিপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে মিলারদের মাধ্যমে ৫৮৫.৯৯০ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত ৯ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে উপজেলা খাদ্য বিভাগ ৪৮টি হাসকিং চাতাল ও রাইস মিলকে সচল দেখিয়ে একটি বরাদ্দ তালিকা প্রস্তুত করে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কোনো সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, সম্পূর্ণ অচল এমনকি অস্তিত্বহীন মিলের নামেও বিপুল পরিমাণ চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি মিলকে পরীক্ষিত ক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৮.৪২০ মেট্রিক টন ও সর্বনিম্ন ৭.৭৭০ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সরবরাহের চুক্তিবদ্ধ দেখানো হয়। তবে বাস্তবে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত ৪৮টি মিলের মধ্যে কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ মিলই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।
মিলের ঠিকানায় গিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক মিলের কোনো অস্তিত্বই নেই। কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢাকা পরিত্যক্ত ভবন, কোথাও মিলের স্থানে খড়ের ঢিবি বা কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এসব চাতালে নেই কোনো উৎপাদন বা উৎপাদনমুখী কার্যক্রম।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মিল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, খাদ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টদের তত্ত্বাবধানে বন্ধ ও অস্তিত্বহীন মিলের নাম ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাইরে থেকে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করে খাদ্য গুদামে সরবরাহ করেছে। এমনকি বরাদ্দের বিপরীতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত মিলের নামে বিভিন্ন প্রকল্পের চাল কম দামে সংগ্রহ করে তা সরকারের নির্ধারিত দামে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে সরকার যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, তেমনি প্রকৃত সচল ও সৎ মিলাররা ন্যায্য বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
খাদ্য গুদাম সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। তবে সংগৃহীত চালের একটি বড় অংশের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মিল মালিক জানান, খাদ্য বিভাগের সঙ্গে যোগসাজশে রাজনৈতিক নেতারা বরাদ্দ দেখিয়ে ফরিয়া নিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের চাল সংগ্রহ করে মজুদ করেন। পরে বন্ধ মিলের নামে দেখানো বরাদ্দের বিপরীতে সেই চালই গুদামে সরবরাহ করা হয়। এতে প্রকৃত মিল পরিচালনা করে খরচ ওঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং অনেক মিল মালিক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
একজন সাবেক মিল মালিক আরও গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, “খাদ্য গুদামে টাকার বিনিময়ে সব ধরনের চাল দেওয়া যায়। চাল সদৃশ্য হলেই চলে, ভালো-মন্দের কোনো যাচাই নেই। এ কারণেই গুদাম থেকে প্রায়ই পঁচা চাল বিতরণের অভিযোগ শোনা যায়।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সচল মিল যাচাই করে নতুন করে বরাদ্দ নির্ধারণ এবং সরকারি চাল সংগ্রহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মিসবাহুল হোসাইন বলেন, যাচাই-বাছাই করেই সচল চাতাল মিলের অনুকূলে মোট ৫৮৬.৯৯০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হক বলেন, “আপনি বললেই তো হবে না, বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান জানান, বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম যেন না ঘটে, সে বিষয়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




















