বিশেষ প্রতিবেদক ১১ জুন ২০২৬ , ৯:৪২:১৩ প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডির শুক্রাবাদে অবস্থিত “আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টার” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্টেম সেল থেরাপি, অল্টারনেটিভ মেডিসিন এবং ফাংশনাল মেডিসিনের আড়ালে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হিসেবে পরিচিত প্রফেসর ড. এম মুজিবুল হক নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে ‘আমেরিকান বোর্ড সার্টিফায়েড ডাক্তার’, ‘ফাইভ স্টার প্রফেসর’ এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রচার করে আসলেও, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তার পরিচয়, চিকিৎসা যোগ্যতা, স্টিমসেল ব্যবসা এবং রোগীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিস্ময়কর সব প্রতারণার তথ্য।
যেভাবে স্টেম সেল থেরাপির নামে চলে কোটি টাকার প্রতারণা
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, “আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টার” দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ইলেট্রিক মিডিয়াতে কনসালটিং ভিডিও প্রতিবেদনের পাশপাশি, সভা, সেমিনার এবং চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় দাবি করা হয়, স্টিমসেল থেরাপির মাধ্যমে বার্ধক্য প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, পক্ষাঘাত থেকে মুক্তি, ক্যান্সার, শারীরিক দুর্বলতা, ওজন বৃদ্ধি, এমনকি প্রতিবন্ধী সন্তানের অবস্থার উন্নতিও সম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, অলটারনেট মেডিসিনের বিজ্ঞাপন দেখে চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের বলা হয়, মাত্র ১০ থেকে ১৫টি স্টিমসেল ইনজেকশন নিলেই বিভিন্ন জটিল রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যার প্রতিটি ডোজ ইনজেকশনের মূল্য প্রায় ৫ লাখ টাকা। ফলে একজন রোগীর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কোর্স সম্পন্ন করতে ব্যয় হয় প্রায় ৫০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পঞ্চাশেরও বেশি লিখিত অভিযোগ রয়েছে এবং অসংখ্য ভুক্তভোগী যথাযথ চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এই কথিত ভুঁয়া ডাক্তারের বিরুদ্ধে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চমূল্যের স্টেম সেল থেরাপি এবং বিভিন্ন খাদ্য-সম্পূরক টনিক গ্রহণের পরও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের শারীরিক অবস্থার উন্নতির পরিবর্তে অবনতি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, চিকিৎসার নামে বিপুল অর্থ নেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে যোগাযোগ এড়িয়ে যাওয়া হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাদের ফোন নম্বর পর্যন্ত ব্লক করে দেওয়া হয়।
অনুমোদনহীন স্টেম সেল ইনজেকশন ব্যবহার হয় যেভাবে
অনুসন্ধানী সূত্র এবং প্রতিষ্ঠানের সাবেক কনসালটেন্টদের বরাত দিয়ে জানা যায়, স্টিমসেল থেরাপিতে ব্যবহৃত ইনজেকশনগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত নয়। অভিযোগ রয়েছে, গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকৃত কিছু ইনজেকশন অতি গোপনে বিদেশ থেকে বিভিন্ন ভ্রমণকারীদের ব্যক্তিগত লাগেজে করে দেশে আনা হয়। পরবর্তীতে এগুলো বিভিন্ন রোগীদের শরীরে চিকিত্সার নামে প্রয়োগ করা হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি ভয়াবহ মাত্রায় পাশ্বরপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টির পাশাপাশি প্রাণ নাশের হুমকী তৈরী করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ওষুধ বা ইনজেকশন মানবদেহে প্রয়োগের আগে তার নিরাপত্তা, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, গবেষণা প্রমাণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। অথচ অভিযুক্ত ডা. মুজিবের এসব স্টিমসেল ইনজেকশনের ক্ষেত্রে এমন কোনো বৈধতা বা অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদন ছাড়াই প্রায় দুই শতাধিক রোগীর শরীরে এসব স্টিমসেল প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিরাপদ উপাদান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। কয়েকজন সাবেক কর্মী দাবি করেছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ স্টিমসেল ব্যবহারের সময় তাদের নিজেদেরও সংশয় ছিল এবং তারা এসব চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।
সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আপত্তি থাকার পরও প্রতারকের অনড় অবস্থান
নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০২৪ সালের মে মাসে বিতর্কিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল কার্যক্রমের কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদনহীন ওষুধ আমদানি, সংরক্ষণ, বিজ্ঞাপন এবং মানবদেহে প্রয়োগ ড্রাগ কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ (সংশোধিত ২০২৩)-এর বিভিন্ন ধারার আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফৌজদারি মামলাসহ সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও যেভাবে বিতর্কিত ডা. মুজিবুল
প্রতিবেদনটির অনুসন্ধান বলছে, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস মেডিকেল বোর্ড মুজিবুল হককে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা সে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। বোর্ডের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তিনি নিজেকে বোর্ড-সার্টিফায়েড চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার কোনো বৈধ চিকিৎসক লাইসেন্স নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় একাধিক লোকাল কমিউনিটি ফোরামেও তিনি ইতিমধ্যে বিতর্কিত ভূঁয়া ডাক্তার হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রেও একাধিক লিখিত অভিযোগ ইতিমধ্যে স্থানীয় প্রসাশনের দফতরে পাঠানো হয়েছে মরমে জানা গিয়েছে।
‘আমেরিকান ডাক্তার’ পরিচয়ের আড়ালে কে এই মুজিবুল হক?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মুজিবুল হকের পরিচয় এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত দাবির মধ্যেও রয়েছে বড় ধরনের বিতর্ক।
তথ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো স্বীকৃত মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস বা সমমানের চিকিৎসা ডিগ্রি অর্জন করেননি। তার একাডেমিক পটভূমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বেসরকারি ওয়েলনেস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কোর্স সম্পন্ন করার পর তিনি নিজেকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি যে সনদের ভিত্তিতে নিজেকে ‘ডাক্তার’ হিসেবে পরিচয় দেন, তা আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ন্যাশনাল ওয়েলনেস প্র্যাকটিশনার্স (AANWP) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ওয়েলনেস প্রশিক্ষণ সনদ। প্রতিষ্ঠানটি ন্যাচারোপ্যাথি, হোলিস্টিক হেলথ, নিউট্রিশন এবং ওয়েলনেস বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলেও এটি কোনো সরকারি মেডিকেল লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা নয়।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা স্পষ্টভাবে জানায়, তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না, চিকিৎসা দিতে পারবেন না এবং নিজেদের চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের সনদ কেবল ওয়েলনেস প্রশিক্ষণের স্বীকৃতি, যা কোনো মেডিকেল লাইসেন্সের সমতুল্য নয়।
মুজিবুল হক নিজেকে টেক্সাসভিত্তিক “University of Integrated Health”-এর অধ্যাপক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তবে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, উল্লিখিত নামে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় একটি রেস্তোরাঁ এবং ফিটনেস সেন্টারের অবস্থান পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে “American Wellness Center” এবং তার বিদেশি সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানী সূত্রগুলো দাবি করেছে, তার প্রচারিত পরিচয়ের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাবিধ সাইবার স্পেসের নিরাপত্তা লঙ্ঘন ও তথ্য বিনষ্টের অভিযোগ
২০১৯ সালে “ইউনিভার্সাল হিলিং বিডি” নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে অনলাইনে কার্যক্রম শুরু করেন মুজিবুল হক। প্রথমদিকে তিনি ভেষজ ও বিকল্প চিকিৎসা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করতেন। পরে ২০২১ সালে পেজটির নাম পরিবর্তন করে “প্রফেসর ড. মুজিবুল হক” রাখা হয়। এরপর থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে থাকেন।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্জিত জনপ্রিয়তা এবং লাখো অনুসারীকে ব্যবহার করে তিনি উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন। অতঃপর সাধারণ মানুষের আস্থা আর সমাজের প্রভাবশালী মহলের অজ্ঞাত পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি সঙ্গবদ্ধ প্রতারণার ফাঁদ। কোন ব্যাক্তি তার প্রতারণা ধরে ফেললে প্রথমে চলে মৌখিক ভাবে সমঝোতার চেষ্টা। সমঝোতায় না আসলে তার বিরুদ্ধে হওয়া সামাজিক মাধ্যমের সকল পোষ্ট, ভিডিও, নিউজ এমনকি যে কোন ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত সামাজিক মাধ্যম গুলোকেও নিজস্ব সাইবার টিমের মাধ্যমে ধ্বংস করা, তথ্য মুছে দেয়া সহ নানাবিধ ভাবে হয়রানী ও ভয়ভীতি প্রদশরন করা হয়।
এব্যপারে ভুক্তোভোগী একাধিক জাতীয় অনলাইন দৈনিকের সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, ডা. মুজিবুলের বিরুদ্ধে হওয়া একাধিক নিউজ এবং ভিডিও প্রতিবেদন, একটি সংগবদ্ধ সাইবার হামলার মাধ্যমে বিনষ্ট করা হয়েছে। এটি অবশ্যই স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য হুমকী ছাড়া কিছুই নয়। আমরা আইনী ভাবে বিষয়টিকে মোকাবেলা করা সহ একটি স্বচ্ছ জবাবদিহীতার মধ্য দিয়ে এ বিষয়টির সমাধানের পথে হাঁটছি। আশাকরি অতিদ্রুত আমরা একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমে অযাচিত হস্তক্ষেপের একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে পারবো।
সমূহ অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুজিবুল হকের বক্তব্য
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মুজিবুল হক দাবি করেন, তার ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি ন্যাচারাল বা অল্টারনেটিভ মেডিসিনভিত্তিক। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের চিকিৎসা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং তার তত্ত্বাবধানে গবেষণাও পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, দেশের খ্যাতনামা চিকিৎসক, সম্পাদক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করেছেন এবং তার প্রতিষ্ঠান দেশের প্রচলিত আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে অভিযোগের বিপরীতে তিনি কোনো অনুমোদনপত্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতির নথি প্রদর্শন করতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।




















