ধর্ম

আখেরি চাহার সোম্বা: ইতিহাস, প্রচলন ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

  প্রতিনিধি ২০ জুলাই ২০২৬ , ১:২২:৫৩ প্রিন্ট সংস্করণ

হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবার উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে এ দিনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ধর্মীয় ও লোকজ রীতির প্রচলন রয়েছে। কেউ নফল নামাজ আদায় করেন, কেউ দোয়া ও দান-সদকা করেন, আবার কোথাও বিশেষ খাবার আয়োজন বা অন্যান্য আচার পালন করা হয়। তবে এ দিনটির ধর্মীয় মর্যাদা ও প্রচলিত আমল নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক মুহাদ্দিস, ফকিহ ও ইসলামি গবেষকের মতে, সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষভাবে ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করার পক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে নির্ভরযোগ্য কোনো স্পষ্ট দলিল নেই। তাহলে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ আসলে কী? এর ঐতিহাসিক ভিত্তিই বা কতটা নির্ভরযোগ্য? ইসলামের দৃষ্টিতে এ দিনের অবস্থান কী?

আখেরি চাহার সোম্বা বলতে কী বোঝায়?

‘আখেরি চাহার সোম্বা’ একটি ফারসি শব্দগুচ্ছ। ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ‘চাহার’ অর্থ চার এবং ‘সোম্বা’ অর্থ বুধবার। অর্থাৎ, ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলতে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়।

উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনটি বহু বছর ধরে পরিচিত। বাংলাদেশে এটি সরকারি ঐচ্ছিক ছুটির তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত। তবে কোনো দিন সরকারি ছুটির তালিকায় থাকা বা সামাজিকভাবে প্রচলিত হওয়া নিজে থেকেই তার ধর্মীয় মর্যাদার প্রমাণ নয়। ধর্মীয় কোনো দিন বা আমলের বিশেষ মর্যাদা নির্ধারণের জন্য কোরআন, সহিহ সুন্নাহ বা গ্রহণযোগ্য শরয়ি দলিল প্রয়োজন।

কেন এ দিনটি পালনের প্রচলন হয়েছে?

আখেরি চাহার সোম্বা পালনের পেছনে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। এই খবর শুনে সাহাবায়ে কেরাম আনন্দ প্রকাশ করেন এবং কেউ কেউ দান-সদকা করেন। পরবর্তী সময়ে সেই ঘটনার স্মরণে দিনটি পালন করার রীতি চালু হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে ইসলামি ইতিহাস ও হাদিসের গবেষকদের একটি বড় অংশ এই দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সঙ্গে সফর মাসের শেষ বুধবারে সুস্থতা লাভের যে ঘটনা প্রচলিত রয়েছে, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট সহিহ দলিল পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে, কোনো কোনো প্রচলিত বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জাদুর ঘটনার সঙ্গেও এ দিনটির সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, জাদুর ঘটনাটি হিজরি সপ্তম বছরের দিকে সংঘটিত হয়েছিল। ফলে সেটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের বছর, অর্থাৎ ১১ হিজরির সফর মাসের শেষ বুধবারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে সহিহ বুখারির ৫৭৬৫ ও ৫৭৬৬ নম্বর হাদিস এবং ইবনু হাজার আল-আসকালানির ‘ফাতহুল বারি’সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থে আলোচনা পাওয়া যায়।

প্রচলিত বিভিন্ন আচার

আখেরি চাহার সোম্বাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের লোকজ রীতি প্রচলিত রয়েছে। কোথাও বিশেষ গোসল করা হয়, কোথাও দোয়া লিখে পানিতে ভিজিয়ে পান করার রীতি রয়েছে, যা অনেক জায়গায় ‘শিফানামা’ নামে পরিচিত। আবার কোথাও বিশেষ খাবার রান্না বা বিতরণেরও প্রচলন দেখা যায়। তবে এসব বিশেষ আচারকে শরিয়ত নির্ধারিত আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো কোরআন, সহিহ হাদিস বা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের আমলের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই এগুলোকে ইসলামের নির্ধারিত বিশেষ ইবাদত বা সুন্নত হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

এ দিনে নফল ইবাদত বা দান-সদকা করা যাবে কি?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ নফল ইবাদত করা এবং কোনো একটি দিনকে শরিয়ত নির্ধারিত বিশেষ ইবাদতের দিন মনে করা এক বিষয় নয়।

কেউ যদি বছরের অন্য যেকোনো দিনের মতো আখেরি চাহার সোম্বার দিনও সাধারণ নফল নামাজ আদায় করেন, কোরআন তিলাওয়াত করেন, দোয়া করেন বা দান-সদকা করেন এবং মনে না করেন যে এই দিনের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ সওয়াব বা শরিয়ত নির্ধারিত ফজিলত রয়েছে তাহলে তা সাধারণ নেক আমল হিসেবেই গণ্য হবে। কিন্তু যদি বিশ্বাস করা হয় যে, সফর মাসের শেষ বুধবারের জন্য বিশেষ কোনো ইবাদত নির্ধারিত রয়েছে, অথবা এ দিনে নির্দিষ্ট আমল করলে অন্য দিনের তুলনায় বিশেষ সওয়াব পাওয়া যাবে, তাহলে সেই বিশ্বাসের পক্ষে নির্ভরযোগ্য শরয়ি দলিল থাকা প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করবে, যার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)

এই হাদিসের ভিত্তিতে বহু আলেমের মত হলো, শরিয়তে নির্ধারিত নয় এমন কোনো আমলকে নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা বিশেষ ফজিলতের সঙ্গে যুক্ত করে ধর্মীয় রূপ দেওয়া উচিত নয়।

আলেমদের মধ্যে মতভেদের বিষয়টি কী?

আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে মুসলিম সমাজে যে মতভেদ রয়েছে, তা মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। প্রথমত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় সফর মাসের শেষ বুধবারে বিশেষভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার যে ঘটনা প্রচলিত, তার ঐতিহাসিক ও হাদিসগত ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, কেউ যদি এই দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজ, বিশেষ গোসল, বিশেষ দোয়া বা বিশেষ খাবারকে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত আমল মনে করেন, তাহলে তার পক্ষে শরিয়তসম্মত প্রমাণ প্রয়োজন কি না এ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে অধিকাংশ গবেষক আলেমের মূল বক্তব্য হলো, কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা দিতে হলে কোরআন বা সহিহ সুন্নাহর সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা জরুরি।

ইসলামের মূলনীতি কী বলে?

ইসলামে ইবাদত মানুষের ইচ্ছা বা সামাজিক প্রচলনের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় না। ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, যে আমল কোরআন, সহিহ সুন্নাহ বা গ্রহণযোগ্য শরয়ি দলিল দ্বারা প্রমাণিত, সেটিই অনুসরণ করতে হবে।

কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, লোকাচার বা সামাজিক রীতির সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস যুক্ত করার আগে তার উৎস ও দলিল যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ কোনো কাজ ভালো মনে হওয়া আর সেটিকে শরিয়ত নির্ধারিত ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।

আখেরি চাহার সোম্বা উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে বহুল পরিচিত একটি দিন। এ দিনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি প্রচলিত থাকলেও, সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করার পক্ষে কোরআন ও সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না এটাই বহু আলেম ও ইসলামি গবেষকের মত।

তাই একজন মুসলিমের জন্য নিরাপদ পথ হলো কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং কোনো নির্দিষ্ট দিনকে দলিল ছাড়া বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা না দেওয়া। একই সঙ্গে বছরের প্রতিটি দিনই নামাজ, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা। কারণ আল্লাহর ইবাদতের জন্য কোনো একটি দিনই একমাত্র সুযোগ নয় একজন মুমিনের জন্য বছরের প্রতিটি দিনই নেক আমলের সুযোগ।

আরও খবর

Sponsered content