প্রতিনিধি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৮:৪৮:২০ প্রিন্ট সংস্করণ
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের মো. লুৎফর রহমান (৮০)। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত এক টাকার শিক্ষক নামে। প্রায় ৫০ বছর ধরে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই, ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন লুৎফর রহমান। কিন্তু অভাবে আর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি তিনি। তবু তিনি শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। নিজের না পাওয়া শিক্ষার কষ্টকে প্রেরণা করে তিনি শিশুদের ঝরে পড়া ঠেকাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোমলমতি শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। শুরুতে তিনি বিনা পয়সায় পড়াতেন। পরে প্রতিদিন মাত্র এক টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।
লুৎফর রহমানের জীবনে এসেছে নানা দুঃসময়। এক সময় তার পরিবার ছিল সচ্ছল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনে সব হারিয়ে ওয়াপদা বাঁধের পাশে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে আশ্রয় নিতে হয় তাকে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ সংগ্রামের পথচলা।
বর্তমানে তিনি স্ত্রী লতিফুন বেগম, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানেই বসবাস করছেন। বড় ছেলে লাভলু অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান, ছোট ছেলে মশিউর দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করেছেন। প্রতিদিন সকালে সাইকেলযোগে কখনো বা হেঁটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটে বেড়ান লুৎফর রহমান। উদ্দেশ্য একটাই- শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া।
বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, কঞ্চিপাড়া, মধ্যপাড়া ও পূর্বপাড়াসহ আশপাশের অন্তত সাত-আটটি গ্রামে তিনি নিয়মিত পড়ান ৩০–৪০ জন শিশু শিক্ষার্থীকে। কোথাও রাস্তার ধারে, কোথাও গাছতলায় কিংবা বাঁধের ওপর বসেই চলে তার শিক্ষাদানের কার্যক্রম।
এ ব্যাপারে লুৎফররহমানের সঙ্গে রোববার (৩০ নভেম্বর) কথা হলে তিনি বলেন, ‘কি আর করার আছে। অনেক গরিব পরিবারে সন্তানেরা লেখাপড়া থেকে পিছিয়ে পড়েছে, তাদের আমি শিখানোর চেষ্টা করছি।’
এক টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘টাকা-পয়সার অভাবে তার বাবা উচ্চ শিক্ষিত করতে পারেন নাই। টাকা বড় কথা নয়, মনে আনান্দ যোগাতেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক টাকা নেই।’
লুৎফর রহমান বলেন, ‘এসএসসির পর অর্থাভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারিনি। সেই না-পাওয়ার কষ্টই আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই আমি চাই না আমার এলাকার কোনো শিশু পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে থাকুক। প্রথমে বিনা পয়সায় পড়াতাম, পরে নামমাত্র এক টাকা নিতে শুরু করি। কেউ না দিলেও কিছু বলি না। আমার অনেক ছাত্র এখন ডাক্তার, প্রভাষক, অধ্যক্ষ। ওদের সাফল্যই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে খুব কষ্টের মধ্যে আছি। অর্থাভাবে দিন কাটছে। ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছি না , তারপরেও শিশুদের এখনো বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পড়াচ্ছি। শিশুদের পড়াতে গেলেই অভাবের কথা ভুলে যাই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমার এই কাজ অব্যাহত রাখতে চাই।














