নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার: ১ নভেম্বর ২০২৫ , ২:৫৯:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে শনিবার (১ নভেম্বর) থেকে। তবে কোনো জাহাজ না ছাড়ায় প্রথম দিনেই পর্যটকশূন্য ছিল দ্বীপটি।
পর্যটন মৌসুমের সূচনায়ও যাত্রী সংকটে জাহাজ মালিকরা ভ্রমণ চালু করেননি। কারণ, নভেম্বর মাসে রাতে অবস্থান নিষিদ্ধ থাকায় পর্যটকদের আগ্রহ কমে গেছে বলে জানা গেছে।
শনিবার সকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে গিয়ে দেখা যায়—সেন্টমার্টিনগামী কোনো জাহাজ নোঙর করেনি। কেবল একটি টাগশিপ মহেশখালীমুখী যাত্রী নিয়ে রওনা দেয়।
খুলনার খালিশপুর থেকে আসা পর্যটক রফিক আল ইসলাম বলেন,“সেন্টমার্টিন এমন এক জায়গা, যেখানে সময় থেমে যায়। কিন্তু দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার বাধ্যবাধকতায় সেই স্বপ্নময় সময় কাটানোর সুযোগটা হারিয়ে যাচ্ছে।”
কুমিল্লার মুরাদনগরের জেমি ইসলাম বলেন,“সেন্টমার্টিন মানেই নিরিবিলি বিশ্রাম আর সমুদ্রের সান্নিধ্য। কিন্তু দিনে গিয়ে ফিরে আসার নিয়মে সেই প্রশান্তি আর পাওয়া যায় না।”
ঢাকার মালিবাগের সমীর দেওয়ান বলেন,“দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে অন্তত এক রাত থাকা দরকার। এখনকার নিয়মে দিনে ঘুরে ফিরে আসতে হয়—এতে ভ্রমণের আসল আনন্দটাই নষ্ট হচ্ছে।”
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন,“আজ থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার অনুমতি থাকলেও আমরা জাহাজ ছাড়িনি। দিনে গিয়ে দিনে আসার নিয়মে পর্যটকরা যেতে চান না, তাই জাহাজ চালানো লাভজনক নয়।”
তিনি আরও বলেন,“পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিদওয়ানা হাসান একবার সেন্টমার্টিন এসে আমাদের অবস্থা দেখলে বোঝতে পারবেন, এখানে ব্যবসায়ীরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত।”
প্রায় নয় মাস পর উন্মুক্ত হওয়া দ্বীপে পর্যটকদের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণের অনুমতি থাকবে; রাতে থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত আকারে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকবে—প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২,০০০ পর্যটক।
ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিএ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযানকে সেন্টমার্টিনে যাতায়াতের অনুমতি দিতে পারবে না। টিকিট ক্রয় করতে হবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমোদিত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে। প্রতিটি টিকিটে থাকবে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড, নকল টিকিটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দ্বীপে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়া বনে প্রবেশ বা ফল সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া—
কাছিম, পাখি, প্রবালসহ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না।
সৈকতে কোনো মোটরচালিত যানবাহন চলবে না।
পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী বহন নিষিদ্ধ।
পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক বহনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সেন্টমার্টিন বাজার সমিতির সভাপতি আব্দুর রহমান বলেন,“রাত্রিযাপন ছাড়া পর্যটক এখানে আসবে না। বর্তমানে আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি।”
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন,“দ্বীপের অর্থনীতি এখন প্রায় পঙ্গু। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্রলার—সবই বন্ধের পথে। আমরা পরিবেশ রক্ষার পক্ষে, তবে জীবিকার বিষয়টি সরকার যেন বিবেচনায় নেয়।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন,“দ্বীপে মোটরযান নিষিদ্ধ থাকবে এবং পর্যটক নিয়ন্ত্রণে কড়া নজরদারি থাকবে। পরিবেশ রক্ষায় এসব পদক্ষেপ অপরিহার্য।”




















