প্রতিনিধি ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ , ১২:০০:৩৩ প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দঘন উৎসব হলো বড়দিন। খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছে বড়দিন যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন হিসেবে পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ। আজ এটি শুধু ধর্মীয় নয় বরং মানবতা ও ভালোবাসার এক বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মাঝে বড়দিন এমন একটি উৎসব যা ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানবতার মহোৎসবে রূপ নিয়েছে। বড়দিন সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে আনন্দ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও উদ?যাপনের প্রতীক। পৃথিবীর নানা দেশে, নানা সংস্কৃতিতে, নানা মানুষের মাঝে বড়দিন ছড়িয়ে দেয় আনন্দ, সৌহার্দ, শান্তি ও মানবকল্যাণের বার্তা। নতুন পোশাক পরিধান করা, ঘরবাড়ি সাজানো, প্রার্থনা, কেক কাটা, উপহারবিনিময়, শিশুদের আনন্দ, পারিবারিক বন্ধনÑ সব মিলিয়ে বড়দিন আজ একটি অনন্য উৎসবে পরিণত হয়েছে।
খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুসারে আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে ইসরায়েলের বেথলেহেম নামক স্থানে যিশুখ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের মধ্য দিয়েই মানবজাতির কাছে মুক্তি, আলো ও শান্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এক দুর্দিনে, এক সাধারণ গোয়ালঘরে তার জন্ম হয়। পৃথিবীর বিলাসবহুল প্রাসাদ নয়, বরং অত্যন্ত সাধারণ এক আশ্রয়স্থলকে বেছে নেওয়া যেন মানবজাতিকে যিশুখ্রিস্টের বিনয়, ত্যাগ ও সহমর্মিতার অনন্য শিক্ষা দেয়। সেই বিনম্র জন্মের ঘটনাকে স্মরণ করতেই প্রতিবছর খ্রিস্ট বিশ্বাসীরা বড়দিন পালন করে থাকে।
সাধারণত ২৫ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী বড়দিন উদযাপিত হয়ে থাকে। যিশুখ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেন প্রথম শতাব্দীতে। কিন্তু প্রথম ২০০-৩০০ বছর খ্রিস্টানরা কোনো ‘জন্মোৎসব’ পালন করত না। তারা বেশি গুরুত্ব দিত যিশুর শিক্ষা, মৃত্যু ও পুনরুত্থানকে (ইস্টার)। কারণ প্রাচীন ইহুদি ও প্রাথমিক খ্রিস্টান সংস্কৃতিতে জন্মদিন উদযাপনের রীতি ছিল দুর্বল; বরং ‘মুক্তি’ ও ‘ত্রাণকর্ম’ ছিল কেন্দ্রে। ৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক বড়দিন পালনের প্রমাণ পাওয়া যায়। চতুর্থ শতাব্দী থেকে বড়দিন উদযাপন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন যিশুর জন্মকে স্মরণ করে চার্চে বিশেষ উপাসনা শুরু হয়। মধ্যযুগে বড়দিন হয়ে ওঠে দীর্ঘ উৎসব, ভোজ, আনন্দ, নাট্যপ্রদর্শনী এবং সামাজিক মিলনমেলার এক উপলক্ষ। এ সময় বড়দিন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বড়দিনের আধুনিক সাংস্কৃতিক রূপের জন্ম ভিক্টোরিয়ান যুগে। ইউরোপীয় উপনিবেশ ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে বড়দিন উযদাপন বিশ্বজুড়ে বিস্তার লাভ করে। আজ বর্তমান সময়ে এসে বড়দিন ধর্মীয় উৎসব, পারিবারিক মিলনমেলা, মানবতা ও শান্তির প্রতীক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইভেন্টের এক বর্ণিল রূপ লাভ করেছে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বড়দিন এখন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুধু খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নয়, অন্য ধর্মীয় সমাজেও এটি একটি আনন্দময় উপলক্ষ। ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রবল শীতের মধ্যেও আলোকসজ্জা, উৎসবের বাজার, ক্রিসমাস ক্যারল, বরফের মাঝে রঙিন সাজসজ্জাÑ সব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে।
পারিবারিক মিলন বড়দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। দূরে থাকা মানুষও এই সময়ে পরিবারে ফিরে আসে, একসঙ্গে খায়, গান করে, প্রার্থনা করে, স্মৃতি তৈরি করে। গির্জায় বিশেষ উপাসনা বা ‘মাস’ অনুষ্ঠিত হয়Ñ এর মাধ্যমেই যিশুর জন্মের উৎসব ক্রিসমাস (ঈযৎরংঃ + গধংং) হিসেবে উৎপত্তি লাভ করেছে।
বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের উৎসব পালন করে। এখানেও বড়দিনকে ‘বড়দিন’ বা ‘ক্রিসমাস’ নামে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উদযাপন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গার গির্জাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত থাকে। মধ্যরাতের প্রার্থনা, বড়দিনের গান (ক্যারল), শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কেক কাটা, পারিবারিক মিলনÑ সব মিলিয়ে দিনটি ভীষণ আনন্দময় হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে, সংবাদমাধ্যমে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন দরিদ্র ও অনাথ শিশুদের মাঝে খাবার ও উপহার বিতরণ করেÑ যা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বড়দিন মানেই আনন্দ, সাজসজ্জা, গান, নাটক, কেক, শিশুদের উল্লাস ও পারিবারিক মিলনমেলা। বিশেষ করে শিশুদের কাছে বড়দিন মানে সান্তা ক্লজ, উপহার, রঙিন সাজসজ্জা ও অফুরন্ত খুশি। পরিবার ও সমাজে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ভাগাভাগির শিক্ষা তারা এই দিন থেকেই পায়।
তবে বড়দিনের সামাজিক আনন্দময় উপলক্ষের মাঝে এ কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, বড়দিন কেবল একটি উৎসব নয়, এটি একটি শিক্ষা। এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যিশুখ্রিস্ট মানবজাতির জন্য ঈশ্বরের এক মহান উপহার। লূক ২:১০-১১ পদে লেখা আছে, ‘স্বর্গদূত বললেন, ভয় পেয়ো না; দেখ, আমি তোমাদের জন্য এমন এক সুসংবাদ এনেছি, যা সমগ্র জাতির জন্য মহান আনন্দের কারণ হবে। আজ দায়ূদের নগরে তোমাদের জন্য এক ত্রাণকর্তার জন্ম হয়েছে, যিনি হলেন খ্রিস্ট প্রভু।’
খ্রিস্টধর্মে যিশুখ্রিস্ট শুধু একজন নবজাগরণকারী নন, বরং ঈশ্বরের প্রেরিত ত্রাণকর্তা। তার জন্ম মানে মানবজাতির জন্য করুণার আলোকিত অধ্যায়ের সূচনা। তাই যিশুর জন্মের ভবিষ্যদ্বাণী আগেই বহুবার করা হয়েছিল। বাইবেলের যিশাইয় ৭:১৪ পদে আছে ‘সে জন্য প্রভু নিজেই তোমাদের একটি চিহ্ন দেবেন; দেখ, এক কুমারী গর্ভবতী হবে এবং সে একটি পুত্রসন্তান প্রসব করবে, এবং তার নাম রাখা হবে ইম্মানুয়েল।’ আবার যিশাইয় ৯:৬ পদে আছে, ‘কারণ আমাদের জন্য একটি শিশু জন্মগ্রহণ করল, আমাদের জন্য একটি পুত্র দান করা হলো; তার কাঁধে থাকবে কর্তৃত্ব, এবং তার নাম হবেÑ আশ্চর্য উপদেষ্টা, পরাক্রমশালী ঈশ্বর, অনন্ত পিতা, শান্তির রাজকুমার।’
যিশুখ্রিস্টের জন্মগ্রহণের পরিকল্পনা ছিল মানবজাতির কল্যাণের জন্য। যিরমিয় ২৯:১১ পদে লিখিত আছে : ‘কারণ আমি তোমাদের জন্য যে পরিকল্পনা করেছি তা আমি জানিÑ সেটি কল্যাণের পরিকল্পনা, অনিষ্টের নয়; ভবিষ্যৎ ও আশা দেওয়ার পরিকল্পনা।’
বড়দিন তাই শুধু আনন্দ বা উৎসবের দিন নয়; এটি আত্মবিশ্লেষণ, প্রার্থনা, মানবতার শিক্ষা গ্রহণ এবং পরস্পরের প্রতি সদাচরণ করার অঙ্গীকারের দিন।
আজকের এই বিভাজিত, সহিংসতায় পরিপূর্ণ পৃথিবীতে বড়দিনের ভালোবাসা, শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেখানে মানুষ স্বার্থে বিভক্ত, সমাজে বৈষম্য বাড়ছে, সেখানে বড়দিন শিক্ষা দেয়Ñ মানুষ মানুষের জন্য, ভালোবাসা ঘৃণাকে পরাজিত করে, শান্তি যুদ্ধের চেয়ে বড়, মানবতা ধর্মের চেয়ে শক্তিশালী।
তাই বড়দিন শুধু উৎসব নয়, এটি আত্মশুদ্ধি ও মানবতার শিক্ষার দিন। যোহন ১৪:২৭ পদে যিশু নিজেই বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কাছে শান্তি রেখে যাচ্ছি; আমার নিজের শান্তি তোমাদের দিচ্ছি। আমি যেমন দিই, জগৎ তেমনি দেয় না। তোমাদের হৃদয় বিচলিত না হোক, ভয়ও না করো।’
বড়দিন আজ শুধু খ্রিস্টধর্মের উৎসব নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির আনন্দ, ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক। এই দিন আমাদের শেখায় মানুষকে ভালোবাসতে, অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়াতে এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে। আমরা সবাই যদি বড়দিনের এই আদর্শ নিজের জীবনে ধারণ করতে পারি, তবে পৃথিবী আরও সুন্দর, মানবিক ও শান্তিময় হয়ে উঠবে। ভালোবাসা ও শান্তি সবার জীবনে ছড়িয়ে পড়ুক। শুভ বড়দিন।














