রাজশাহী প্রতিনিধি ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ১২:৪১:৩৫ প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসি)-এর সাম্প্রতিক এক বদলি আদেশ ঘিরে করপোরেশনের ভেতরে ও বাইরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, শ্রমিক রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে। রাজশাহী থেকে বগুড়ায় বদলি হওয়া সত্ত্বেও মো. হারুন অর রশিদ যেভাবে কার্যত বহাল তবিয়তেই রয়েছেন, তাতে সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক বদলি হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
বিএডিসির সংস্থাপন বিভাগ থেকে জারি করা অফিস আদেশে সিড টেস্টার পদে কর্মরত মো. হারুন অর রশিদকে উপপরিচালক (পাটবীজ) দপ্তর, বিএডিসি রাজশাহী থেকে একই পদে উপপরিচালক (পাটবীজ) দপ্তর, বিএডিসি বগুড়ায় বদলি করা হয়। আদেশে তা অবিলম্বে কার্যকর বলেও উল্লেখ রয়েছে। তবে আদেশ জারির পরই করপোরেশনের অন্দরমহলে প্রশ্ন ওঠে—বদলি কার্যকর হলে কেন তিনি এখনও বিএডিসি শ্রমিক কর্মচারী লীগ (সিবিএ)-এর রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।
বিএডিসির অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মো. হারুন অর রশিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয়ের মধ্যে। সূত্রগুলোর মতে, তিনি কেবল একজন কর্মকর্তা নন; বরং রাজশাহী অঞ্চলের শ্রমিক রাজনীতিতে এমন এক অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করতে পারে না। এক কর্মকর্তার ভাষায়, “বদলি কাগজে হয়, কিন্তু ক্ষমতা থাকে মাঠে—হারুন অর রশিদের ক্ষেত্রে সেটাই দেখা যাচ্ছে।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে উঠে আসে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে মো. হারুন অর রশিদ জাতীয় শ্রমিক লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জাতীয় শ্রমিক লীগের বিভিন্ন মিছিল, সভা ও সমাবেশে তাঁকে নিয়মিত সামনের কাতারে দেখা যেত। এই দৃশ্যমান উপস্থিতিই তাঁকে শাসকদলের শ্রমিক রাজনীতির একজন প্রভাবশালী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার প্রভাব এখনো কাটেনি বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।
একজন শ্রমিক সংগঠক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় শ্রমিক লীগের যেকোনো বড় কর্মসূচিতে হারুন অর রশিদ মানেই সামনের সারি—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।” আরেকটি সূত্রের মন্তব্য, “এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই বদলি হলেও তাঁকে সাংগঠনিকভাবে স্পর্শ করা হয়নি।”
সূত্রগুলো আরও জানায়, রাজশাহী জেলা শাখায় তাঁর বিকল্প নেতৃত্ব এখনো দৃশ্যমানভাবে গড়ে না ওঠায় তাঁকে সরানোর বিষয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও অনীহা ছিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোগাযোগ, শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব এবং মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে তাঁকে বাদ দিয়ে সংগঠন পরিচালনার ঝুঁকি নিতে চায়নি সংশ্লিষ্ট মহল।
রাজশাহী অঞ্চলের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যেও তাঁর অবস্থান শক্ত বলেই জানা গেছে। কেউ কেউ তাঁকে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের পরীক্ষিত নেতা হিসেবে দেখেন, আবার অনেকে নীরবে স্বীকার করেন—তাঁর প্রভাব উপেক্ষা করা বাস্তবে কঠিন। এক জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর ভাষায়, “তিনি যা বলেন, তার পেছনে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ওজন থাকে—এটাই বাস্তবতা।”
এদিকে বিএডিসির প্রশাসনিক অন্দরমহলেও এই প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে বদলি কেবল কাগুজে সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে; বাস্তব ব্যবস্থাপনায় তাঁদের অবস্থান হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। মো. হারুন অর রশিদের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটেছে বলে তাঁদের ধারণা।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনিকভাবে বদলি হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা, জাতীয় শ্রমিক লীগের কর্মসূচিতে দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের শ্রমিক রাজনীতির দাপটের কারণেই মো. হারুন অর রশিদ এখনো কার্যত বহাল রয়েছেন। বদলেছে তাঁর কর্মস্থলের ঠিকানা, কিন্তু বদলায়নি তাঁর ক্ষমতার অবস্থান কিংবা প্রভাব বলয়। উল্লেখ্য, তিনি টানা প্রায় ১৬ বছর রাজশাহীতে কর্মরত ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. হারুন অর রশিদ বলেন, “আমি বিএডিসি শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলাম। তবে কোনো অনিয়ম বা অন্যায় কাজে জড়িত ছিলাম না।”
অন্যদিকে, বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও বিএডিসি রাজশাহীর উপপরিচালক (পাটবীজ) এইচ এস জাহিদুল ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।














