সারাদেশ

ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে কুয়াকাটা সৈকত

  এ এম মিজানুর রহমান বুলেট, কলাপাড়া (পটুয়াখালী): ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১:০২:১৯ প্রিন্ট সংস্করণ

ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বর্ষা এলেই পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। বছরের পর বছর ধরে চলা এ ভাঙনে সংকুচিত হচ্ছে সৈকতের প্রস্থ। বিলীন হচ্ছে বনাঞ্চল, স্থাপনা ও বসতভিটা। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে এসব সামগ্রী ব্যবহারে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও নষ্ট হচ্ছে।

১৯৯৮ সালে কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। তখন লেম্বুরবন থেকে গঙ্গামতির পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের দৈর্ঘ্য ছিল ১৮ কিলোমিটার। বর্তমানে পশ্চিমে তিন নদীর মোহনা থেকে পূর্বে রামনাবাদ মোহনা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি প্রায় ২৯ কিলোমিটার। তবে দৈর্ঘ্য বাড়লেও প্রতিবছর সাগরের ঢেউ, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বালু ক্ষয়ে সৈকতের প্রস্থ ক্রমেই কমছে।

স্থানীয়দের দাবি, গত ৪০ থেকে ৫০ বছরে সমুদ্র প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ভেতরে এগিয়ে এসেছে। গত এক দশকে ভাঙনে নারিকেলবাগান, এলজিইডির ডাকবাংলো, ডিসি পার্কের একাংশ, জাউবাগান, ভূমি অফিসের গেস্ট হাউস, হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন অনেক মানুষ।

স্থানীয়রা জানান, একসময় কুয়াকাটা সৈকতে ছিল বড় বড় বালুর টেক ও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। সমুদ্রের কাছে যেতে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। এখন সমুদ্র লোকালয়ের একেবারে কাছে চলে এসেছে। এতে কুয়াকাটার অস্তিত্ব ও পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটক নাদিম ও রবিন বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে এসে সৈকতের বর্তমান অবস্থা দেখে তারা হতাশ। সৈকত রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বালু ক্ষয়ের কারণে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হচ্ছে। এ বছরও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, ট্যুরিস্ট বক্স, মসজিদ, মন্দির ও মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে।

সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের জিএম আল আমিন হাওলাদার বলেন, ভাঙন অব্যাহত থাকলে পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা কুয়াকাটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। সৈকত রক্ষায় পরিকল্পিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

গণমাধ্যমকর্মী ও পরিবেশকর্মী মেজবাহ উদ্দিন মাননু বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় গত ২০ বছর ধরে স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পটি এখনো ঝুলে আছে। আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তুলতে দ্রুত সৈকত রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। তার দাবি, ম্যানগ্রোভ ও নন-ম্যানগ্রোভ উভয় ধরনের বনাঞ্চল হুমকির মুখে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে।

পাউবো, কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ্ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নে ২০২৪ সালে ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আপাতত জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে জিও টিউব ব্যবহার করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।

আরও খবর

Sponsered content