প্রতিনিধি ২৩ জুলাই ২০২৬ , ১১:২২:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত থামাতে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কাতার, মিসর ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সাময়িক বিরতি আনা এবং সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তবে তেহরান কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে তিনি রাজি হননি।
১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে ১০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে আগে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকটি আবার কার্যকর করার কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্যতম বড় বিরোধ তৈরি হয়েছে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে আগে হওয়া সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং এর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু শর্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির ভাষা স্পষ্ট না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। ফলে যে সমঝোতা যুদ্ধ কমানোর কথা ছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে নতুন বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে কোন নৌপথ ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
ইরান দাবি করে, নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দিষ্ট কিছু নৌপথ ব্যবহার করতে হবে এবং ইরানের অনুমোদন ছাড়া কোনো কোনো এলাকায় জাহাজ চলাচল করা যাবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রণালিটি অবাধ রাখতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বৈত ব্যাখ্যাই সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
যুদ্ধবিরতি কেন ভেঙে পড়ল?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এর আগে একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আলোচনা চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। আলোচনার সম্ভাব্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যত ব্যবস্থাপনা, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানের জব্দ করা সম্পদ, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি, দুই পক্ষের সামরিক উত্তেজনা কমানোর ব্যবস্থা। তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত কে কীভাবে পালন করছে, তা নিয়ে শুরু থেকেই মতবিরোধ দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সমঝোতার শর্ত ভঙ্গ করে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের মধ্যেই নতুন করে হামলা শুরু হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘোষণা করেন, আগের যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
কূটনীতি চলছে, কিন্তু হামলাও বাড়ছে
কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও সামরিক সংঘাত থামেনি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানও পাল্টা হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও আঞ্চলিক স্বার্থে আঘাত হানার চেষ্টা করছে। সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, হামলার লক্ষ্যবস্তু ক্রমেই সামরিক স্থাপনার বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। ইরানের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় সেতু, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডানসহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি থাকা দেশগুলোও সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়ছে।
‘প্রতিশোধের চক্রে’ আটকে পড়ছে দুই পক্ষ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি হামলার পর পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এক পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ অন্য পক্ষের ওপর আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার চাপ তৈরি করছে। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবনের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে একটি ‘উত্তেজনার ফাঁদে’ আটকে ফেলতে পারে। কারণ, প্রতিটি নতুন হামলার পর রাজনৈতিকভাবে পিছু হটা দুই পক্ষের জন্যই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনো চুক্তি কার্যকর করতে হলে আগের সমঝোতার মতো অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। কোন পক্ষের কী দায়িত্ব, কোন নৌপথে কীভাবে জাহাজ চলবে এবং কোনো পক্ষ শর্ত ভঙ্গ করলে তার পরিণতি কী হবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য শর্ত থাকতে হবে।
আলোচনায় ফিরবে কি ইরান?
কূটনৈতিক উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামরিক অভিযান চলার মধ্যে দুই পক্ষ কতটা আলোচনায় ফিরতে আগ্রহী। ইরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে তেহরানের মধ্যে ওয়াশিংটনের ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চাইছে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি অবাধ রাখার নিশ্চয়তা দিক। বিশ্লেষকদের মতে, এই আস্থার সংকট দূর করা না গেলে নতুন কোনো যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা
সংঘাত যদি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেবেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক অবকাঠামোতে হামলা পরিস্থিতিকে আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ বা বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হবে। এতে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
কূটনীতির সামনে শেষ সুযোগ?
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতাকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো দুই পক্ষকে অন্তত সাময়িকভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করানো এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। তবে কেবল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি বা আগের সমঝোতা পুনর্বহাল করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি নিজেদের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তাহলে কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। আর প্রতিটি নতুন দফার হামলা সেই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।















